কখনো সাংবাদিক, কখনো রাজনৈতিক নেতার ঘনিষ্ঠ সহচর, আবার কখনো প্রশাসনের প্রভাবশালী কর্তাদের ‘সোর্স’। এই একাধিক পরিচয়কে ঢাল বানিয়ে গত দেড় দশকে গাজীপুর ও নেত্রকোনায় অপরাধের এক অভেদ্য সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন বিপ্লব হোসেন ফারুক। আওয়ামী শাসনামলে সাবেক এমপি আহমদ হোসেনের আশীবাদপুষ্ট এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ‘হানি ট্র্যাপ’ (ব্ল্যাকমেইলিং) এবং শত শত বিঘা জমি দখলের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সরকার পরিবর্তন হলেও তার দাপট কমেনি, বরং কৌশলে বহাল তবিয়তে চালিয়ে যাচ্ছেন তার অপকর্ম।
ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার হয়ে ঘরছাড়া জাহানারা।
ফারুকের প্রতারণার জাল কতটা ভয়াবহ, তার প্রমাণ গাজীপুরের এনায়েতপুর এলাকার বাসিন্দা জাহানারা বেগম। স্বামীর প্রবাসে থাকার সুযোগে জমি উদ্ধারের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে জাহানারার কাছ থেকে প্রথমে ১ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেন ফারুক। এরপর কৌশলে একটি ব্ল্যাংক চেক হাতিয়ে নিয়ে তাতে ৫ লক্ষ টাকা বসিয়ে ‘চেক ডিজঅনার’ মামলা ঠুকে দেন।(শুধু তাই নয় ব্ল্যাংক চারটি প্রথমে ফটোকপি করে ডাবল তৈরি করে একটি কপিতে তার নাম মোঃ ফারুক মিয়া এবং আরেকটি কপিতে মোহাম্মদ আলাউদ্দিন লিখে ভুক্তভোগী জাহানারার নিকট পাঠিয়ে দেয়। চেকের পাতা SBB/E নম্বর হচ্ছে-2426507
নির্যাতনের এখানেই শেষ নয়; ভুক্তভোগী নারীর মান-সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিতে ফারুক তাকে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন এবং এডিট করা আপত্তিকর ছবি প্রবাসে থাকা স্বামী ও স্বজনদের কাছে পাঠিয়ে ‘পরকীয়া’র মিথ্যা প্রচার চালান। এবং জাহানারা কে নিয়ে হোটেলে রাত কাটানোর প্রমাণপত্র হিসেবে হোটেল এশিয়া নামের এক ভর্তি খাতা থেকে কপি তৈরি করে জাহানারার স্বামীর ঠিকানায় পাঠিয়ে দেয়। (অথবা এটি সে নিজেই তৈরি করে)
ফারুকের দাবি ছিল, জাহানারা তার সাথে হোটেলে রাত কাটিয়েছেন। এমন মানসিক ও সামাজিক চাপ সইতে না পেরে বর্তমানে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে পিত্রালয়ে আশ্রয় নিয়েছেন এই নারী। ভেঙে গেছে তার সাজানো সংসার।
তথ্যসূত্র: জয়দেবপুর থানা জিডি নং-১৯২৫ (২৯/১/২০১৮)।
দখলদারিত্বের ম্যাপ: গাজীপুর থেকে নেত্রকোনা
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফারুক যে বাড়িতে বসবাস করছেন সেটিও দখল করা জমিতে নির্মিত। গাজীপুরের এনায়েতপুর মৌজার (আর এস দাগ নং-৮২৫) জালাল উদ্দিনের জমি দখল করে এই অট্টালিকা তুলেছেন তিনি।
নিজের এলাকা নেত্রকোনার পূর্বধলাতেও তিনি সমান হিংস্র। সেখানে নিজ বংশীয় চাচা মোতালেব ও আব্দুল খালেকের প্রায় ২ একর পৈতৃক সম্পত্তি জোরপূর্বক দখল করেছেন। ভুক্তভোগীরা জানান, জমি ফেরত দেওয়ার নাম করে মোতালেবের কাছ থেকে ৩ লক্ষ টাকা নগদ নিয়েও উল্টো তাদের বিরুদ্ধেই মিথ্যা মামলা করেন ফারুক। যদিও প্রয়োজনীয় দলিল দেখাতে না পারায় আদালত মামলাটি খারিজ করে দেয়।
তথ্যসূত্র: বিজ্ঞ সিনিয়র সহকারী জজ আদালত নেত্রকোনা, মামলা নং ২৬০/২০২১।
সাংবাদিকতার ‘তকমা’ ও ভুয়া সার্টিফিকেট
বিপ্লব হোসেন ফারুক নিজেকে ‘দৈনিক অগ্নিশিখা’ পত্রিকার সহকারী সম্পাদক বা স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে পরিচয় দেন। তবে অনুসন্ধানে তার কোনো বৈধ একাডেমিক সার্টিফিকেট পাওয়া যায়নি। অভিযোগ রয়েছে, ইন্টারমিডিয়েট পাসের ভুয়া সার্টিফিকেট তৈরি করে তিনি বিভিন্ন প্রেস ক্লাবের সদস্যপদ বাগিয়ে নিয়েছেন। এই পরিচয় ব্যবহার করেই তিনি থানা-পুলিশে দালালি এবং স্থানীয়দের ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদাবাজি করে আসছেন।
নেপথ্যের কুশীলবরা
সাবেক ডিবি কর্মকর্তা হারুন অর রশীদের ‘সোর্স’ হিসেবে একসময় গাজীপুরে দাপট দেখাতেন ফারুক। এছাড়া নেত্রকোনা-৫ আসনের সাবেক এমপি আহমদ হোসেনের সাথে ঘনিষ্ঠতা এবং তার বোন শাহনাজ পারভীন (নেত্রকোনা জেলা পরিষদের পলাতক সদস্য) এর প্রভাবে তিনি নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে মনে করতেন।
ভুক্তভোগীদের দাবি: > “আমরা শুধু আমাদের জমি বা টাকা ফেরত চাই না, আমরা এই ব্ল্যাকমেইলারের কঠিন শাস্তি চাই। সাংবাদিকতার পবিত্র পেশাকে কলঙ্কিত করে ফারুক অসংখ্য পরিবারকে পথে বসিয়েছে।”
বর্তমানে ফারুক গাজীপুরের কাশিমপুর এলাকায় অবস্থান করে তার অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো এই ‘ছদ্মবেশী’ সাংবাদিকের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
প্রিন্ট
ফারুক আহমদ, কাশিমপুর প্রতিনিধি, গাজীপুর | 



















