গাজীপুর শহরের টঙ্গী রাজস্ব সার্কেলে বেপরোয়া ঘুষ বাণিজ্য চলছেই।’নো মানি, নো সার্ভিস’ নীতিতে অটল রয়েছেন অভিযুক্তরা। মুখ খুললেই সেবাপ্রার্থীদের ফাইল আটকে করা হচ্ছে হয়রানি।
গত ১৯ ডিসেম্বর দৈনিক সময়ের কন্ঠের প্রথম পৃষ্ঠায় ‘টঙ্গী রাজস্ব সার্কেলে ঘুষের উচ্চ রেট, এসিল্যান্ড বেপরোয়া’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এ নিয়ে চলে তোলপাড়।
পরে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আলম হোসেন গত ৩০ ডিসেম্বর টঙ্গী রাজস্ব সার্কেল পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ মোজাহেরুল হককে স্বচ্ছতার সঙ্গে সেবা প্রদানের জন্য নির্দেশ দেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমান জেলা প্রশাসক ভূমিসেবায় অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রতিরোধের চেষ্টা করছেন। কিন্তু এসিল্যান্ড মোজাহেরুল হকের মতো কর্মকর্তারা নির্দেশনা না মানায় সুফল মিলছে না। তাই জনস্বার্থে কর্তৃপক্ষের আরও সোচ্চার হওয়া উচিত।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যমতে, ভূমি সংক্রান্ত সেবা সহজীকরণের লক্ষ্যে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ তিনটি তহশিল অফিস নিয়ে পৃথক টঙ্গী রাজস্ব সার্কেল গঠিত হয়। অফিসগুলো হল টঙ্গী পৌর ভূমি অফিস, গাছা ইউনিয়ন ভূমি অফিস ও কাশিমপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিস। কিন্তু দীর্ঘদিনেও কাঙ্ক্ষিত সেবা মেলেনি।
আলোচিত সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোজাহেরুল হক গত ২৫ আগস্ট টঙ্গী রাজস্ব সার্কেলে যোগদান করেন। তার যোগদানের পরই জমির নামজারি ও জমাভাগে ঘুষের রেট অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায়। যা অন্যান্য এসিল্যান্ড অফিসের তুলনায় সর্বোচ্চ।
অফিসটিতে জমির মূল জোতের খারিজপ্রতি ২ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশ পর্যন্ত ঘুষের রেট ১৫ হাজার টাকা, ২০ শতাংশ থেকে ৩৯ শতাংশ পর্যন্ত ৩০ হাজার টাকা, ৪০ শতাংশের বেশি হলে ৫০ হাজার টাকা, খারিজ থেকে খারিজে ৬ শতাংশ পর্যন্ত দুই হাজার টাকা, ১৯ শতাংশ পর্যন্ত ১০ হাজার টাকা, ২০ শতাংশ থেকে ৩৯ শতাংশ পর্যন্ত ২০ হাজার টাকা, ৪০ শতাংশ বা এর বেশি হলে ৪০-৫০ হাজার টাকা, অবমুক্ত হওয়া অর্পিত সম্পত্তির ‘খ’ তফসিলভুক্ত জমির ক্ষেত্রে মূলের খারিজে ১৯ শতাংশ পর্যন্ত ৩০ হাজার টাকা, ২০ শতাংশ বা এর বেশি হলে ৬০ হাজার টাকা, খারিজ থেকে খারিজে ১৯ শতাংশ পর্যন্ত ১০ হাজার টাকা এবং ২০ শতাংশ বা এর বেশি হলে ২০ হাজার টাকা দিতে হয়। জমির পরিমাণ আরও বেশি হলে বা কাগজপত্রে কোন ত্রুটি থাকলে মোটা অঙ্কের টাকার চুক্তি ছাড়া কাজ হয় না।
অফিসের সার্ভেয়ার, নাজির ও নামজারি সহকারীরা দালাল এবং তহশিল অফিসের কর্মচারীদের মাধ্যমে আবেদনকারীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আদায় করেন। পরে তা পদ অনুযায়ী ভাগ-বাঁটোয়ারা হয়। তবে বড় অংশ বুঝে নেন এসিল্যান্ড। যা ওপেন সিক্রেট।
টঙ্গীর পাগাড় মৌজায় সোয়া ৮ শতাংশ জমির নামজারির জন্য আবেদন করে মনিরুজ্জামান গং। নথি নম্বর ১৮৭৯/২৫-২৬। টঙ্গী পৌর ভূমি অফিস থেকে নামজারির সুপারিশ করে প্রতিবেদন পাঠানোর পর এসিল্যান্ড মোজাহেরুল হক তা নামঞ্জুর করে দেন। নামঞ্জুরের কারণ হিসেবে মালিকানা স্বত্ব প্রমাণিত না হওয়া ও অসম্পূর্ণ আবেদনের কথা উল্লেখ করা হয়। রিভিউ করার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
পরে একই তফসিলের দ্বিতীয়বার আবেদন করা হয়। নথি নম্বর ৭৭১১/২৫-২৬। এবার দাবিকৃত ৩০ হাজার টাকা লেনদেন করায় নামজারিটি দ্রুত অনুমোদন হয়ে যায়। এ ধরনের অনেক অভিযোগ রয়েছে।
সেবাপ্রার্থীরা বলছেন, টঙ্গী রাজস্ব সার্কেলে টাকা ছাড়া কাজ হয় না। টাকা না দিলে তুচ্ছ বা ইচ্ছাকৃত কারণ দেখিয়ে আবেদন নামঞ্জুর করা হয়। মিসকেস ও জমির সীমানা নির্ধারণ সংক্রান্ত ডিমারকেশনেও বড় বাণিজ্য হচ্ছে।
এদিকে টঙ্গীর আরিচপুর মৌজায় আড়াই শতাংশ জমির নামজারির জন্য আবেদন করে দিলরুবা গং। নথি নম্বর ৬৯৫৯/২৫-২৬। টঙ্গী পৌর ভূমি অফিস থেকে নামজারির সুপারিশ করে প্রতিবেদন পাঠানোর পর এসিল্যান্ড তা নামঞ্জুর করেন।
নামঞ্জুরের কারণ হিসেবে পূর্বের নামজারি অস্পষ্ট থাকার কথা উল্লেখ করা হয়। পরে আবেদনকারীরা রিভিউ আবেদন করেন। যদিও নামজারি থেকে নামজারির আবেদনটি নামঞ্জুরের আগে কোন কারণ জানানো হয়নি।
বিষয়টি ঘটনার আড়ালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করায় এসিল্যান্ড মোজাহেরুল হক এবারও কোন শুনানি ছাড়াই রিভিউ আবেদন নামঞ্জুর করে দেন। এতে তাদের ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়।
আবেদনকারী পক্ষের একজন জানান, আবেদনের সঙ্গে দাখিলকৃত কাগজপত্র স্পষ্ট থাকার পরও প্রথম আদেশেই তা অস্পষ্ট দেখিয়ে নামঞ্জুর করা হয়। কোন শুনানি ও যুক্তিসংগত সময় দেওয়া হয়নি। রিভিউ করে চাহিত কাগজপত্র দেওয়ার পরও আবার নামঞ্জুর হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ড ভূমি মন্ত্রণালয়ের জারিকৃত পরিপত্রের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, এসিল্যান্ড ঘুষমুখী না হলে মানুষের হয়রানি অনেক কমে যায়। গাজীপুর সদর উপজেলা ভূমি অফিসের এসিল্যান্ড ভালো থাকায় সেখানে ঘুষের রেট নেই। অফিস প্রধানের ওপরই অনেক কিছু নির্ভর করে। জেলা প্রশাসন চাইলে দৃশ্যত পরিবর্তন সম্ভব। চলবে
প্রিন্ট
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















