রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) গুলশান এস্টেট শাখায় দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম, বিতর্কিত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা ও ফাইল জটের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে উঠে এসেছে রাজউকের উপ-পরিচালক লিটন সরকারের নাম। রাজউকের অভ্যন্তরীণ নথি, মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান এবং একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গুলশান এলাকার কয়েকটি মূল্যবান প্লট ও পরিত্যক্ত বাড়ি নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেখানে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও নথি ব্যবস্থাপনায় গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নিষেধাজ্ঞার তালিকাভুক্ত বা মালিকানা-জটিলতাসম্পন্ন সম্পত্তির ক্ষেত্রে অনুমোদন প্রক্রিয়া অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত এগিয়েছে, কোথাও কোথাও ফাইল রেকর্ড রুমে না গিয়ে সংশ্লিষ্ট শাখায় আটকে থেকেছে, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরোনো নথির অনুপস্থিতিতে ‘লুজ নথি’ খুলে কার্যক্রম এগোনোর চেষ্টা হয়েছে।
গুলশান এস্টেট শাখা রাজউকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শাখা। গুলশান, বনানী ও বারিধারার মতো অভিজাত এলাকায় জমি ও বাড়ির প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এই শাখার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। বাজারদরে এসব এলাকায় কাঠাপ্রতি জমির মূল্য কয়েক কোটি থেকে দশ কোটিরও বেশি হওয়ায় একটি ফাইল নোট বা একটি স্বাক্ষরের আর্থিক প্রভাব অত্যন্ত বড়। ফলে এখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই নানা স্বার্থের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপ-পরিচালক হিসেবে লিটন সরকার এই শাখায় দায়িত্ব পালনকালে প্লট হস্তান্তর, নামজারি সংক্রান্ত মতামত, মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদন গ্রহণ এবং নির্মাণসংক্রান্ত ফাইলের প্রাথমিক যাচাইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। রাজউকের কাঠামো অনুযায়ী, উপ-পরিচালকের নোট ও সুপারিশ ছাড়া অনেক ফাইলই পরবর্তী ধাপে অগ্রসর হয় না। এ কারণেই অভিযোগকারীরা বলছেন, এই পদে থাকা কর্মকর্তার ভূমিকা স্বচ্ছ না হলে অনিয়মের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
একাধিক সূত্র দাবি করেছে, গুলশান এস্টেট শাখায় দায়িত্ব পালনকালে লিটন সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি যে অভিযোগ শোনা যায় তা হলো—টাকা ছাড়া ফাইল এগোয় না। কয়েকজন ডেভেলপার ও ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়ম মেনে কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও ফাইল দীর্ঘদিন আটকে থাকে এবং পরে ‘ম্যানেজ’ করার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে সরাসরি আর্থিক লেনদেনের লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবে একই ধরনের অভিযোগ একাধিক সূত্র থেকে উঠে আসায় বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। রাজউকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গুলশানের মতো জায়গায় ফাইল আটকে রাখা বা ছাড় দেওয়া—দুটোরই বাজারমূল্য আছে, আর সে কারণেই এখানে অভিযোগের মাত্রা বেশি।
পরিত্যক্ত বাড়ি ও মালিকানা-জটিল প্লটের ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ আরও স্পষ্ট। রাজউকের নিজস্ব তালিকা অনুযায়ী, পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে সাধারণত হস্তান্তর ও উন্নয়ন কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকে। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গুলশানের কয়েকটি এমন সম্পত্তিতে সম্প্রতি বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কোথাও পুরোনো বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়েছে, কোথাও ডেভেলপার কোম্পানির সাইনবোর্ড ঝুলেছে, আবার কোথাও নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে ফাইলপত্র যাচাই করতে গিয়ে দেখা যায়, কোনো কোনো পুরোনো নথি পাওয়া যাচ্ছে না। রেকর্ড রুমে খোঁজ করেও সংশ্লিষ্ট হোল্ডিং নম্বরের ফাইল মেলেনি বলে জানান কর্মীরা। নিয়ম অনুযায়ী কাজ শেষ হলে সব ফাইল রেকর্ড রুমে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ফাইল সংশ্লিষ্ট শাখা বা কর্মকর্তার কক্ষে আটকে থাকে বলে অভিযোগ।
রেকর্ড রুমের এক কর্মী বলেন, কিছু হোল্ডিং নম্বর দেখলেই বোঝা যায় ফাইল এখানে নেই। এগুলো ‘সংবেদনশীল’ হিসেবে আলাদা করে রাখা হয়। এই সংবেদনশীলতার কারণ কী—সে প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর কেউ দিতে পারেননি। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ফাইল রেকর্ডে না গেলে ভবিষ্যতে তদন্ত বা যাচাই কঠিন হয়ে পড়ে এবং অনিয়ম আড়াল করা সহজ হয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, গুলশান এস্টেট শাখার কিছু ফাইল দীর্ঘদিন ধরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কক্ষে তালাবন্দি অবস্থায় রয়েছে, যা নিয়মের পরিপন্থী।
রাজউকের ভেতরের একাধিক সূত্র বলছে, এসব বিতর্কিত ফাইলের সঙ্গে উপ-পরিচালক লিটন সরকারের নাম যুক্ত থাকার কারণেই তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও কোনো ফাইলে তার স্বাক্ষর থাকলেই যে অনিয়ম প্রমাণিত হয়—তা নয়, তবে অভিযোগকারীরা বলছেন, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তার মতামত উপেক্ষা করা হয়নি। এ কারণে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া প্রকৃত চিত্র পরিষ্কার হওয়া সম্ভব নয়।
রাজনৈতিক ছত্রছায়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। রাজউকের অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, লিটন সরকার দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে গুলশানের মতো গুরুত্বপূর্ণ শাখায় অবস্থান করেছেন। যদিও এ বিষয়ে কোনো লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবুও কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের সমর্থন থাকলে অভিযোগ ওঠার পরও ব্যবস্থা নিতে দেরি হয়। এই বাস্তবতাই রাজউকের মতো প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সরেজমিনে গুলশানের কয়েকটি বিতর্কিত প্লটে গিয়ে দেখা গেছে, নতুন মালিকানার সাইনবোর্ড, ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের নাম এবং নির্মাণের প্রস্তুতি। স্থানীয় বাসিন্দা ও দোকানদাররা জানান, বহু বছর ধরে পরিত্যক্ত বা ফাঁকা থাকা জায়গায় হঠাৎ করে কাজ শুরু হওয়ায় তারা বিস্মিত। তাদের কেউ কেউ বলেন, মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিন মামলা চলার কথা তারা জানতেন, কিন্তু প্রশাসনিক অনুমোদন কীভাবে এলো—তা তাদের বোধগম্য নয়।
এ বিষয়ে রাজউকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিকভাবে বলেন, রাজউক তার স্বার্থের বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত নেয় না। কোনো অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে তারা স্বীকার করেন, নথি ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা থাকলে তা সংস্কারের প্রয়োজন আছে। ডিজিটাল ফাইল ট্র্যাকিং ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও জানান তারা।
উপ-পরিচালক লিটন সরকারের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে রাজি হননি। তার ঘনিষ্ঠ সূত্রের দাবি, তিনি এসব অভিযোগকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করেন এবং বলেন, নিয়মের বাইরে কোনো কাজ করলে প্রমাণ দিতে হবে। তবে অভিযোগের সুনির্দিষ্ট জবাব বা নথিভিত্তিক ব্যাখ্যা তিনি দেননি।
শহর পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজউকের মতো প্রতিষ্ঠানে একক কর্মকর্তার হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা থাকলে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়। তাদের মতে, ডিজিটাল নথি ব্যবস্থাপনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে বহুপাক্ষিক যাচাই এবং স্বাধীন অডিট চালু না হলে একই ধরনের অভিযোগ বারবার উঠবে। গুলশানের মতো উচ্চমূল্যের এলাকায় এসব সংস্কার আরও জরুরি।
সব মিলিয়ে উপ-পরিচালক লিটন সরকারকে কেন্দ্র করে ওঠা অভিযোগগুলো এখনো তদন্তাধীন ও প্রমাণসাপেক্ষ। তবে অভিযোগের বিস্তৃতি, একই ধরনের বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি এবং নথি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা রাজউকের জন্য সতর্কবার্তা। শতকোটি টাকার সম্পত্তি নিয়ে প্রশাসনের ভেতরেই যদি প্রশ্ন ওঠে, তবে তা শুধু একটি শাখা বা একজন কর্মকর্তার বিষয় নয়, বরং পুরো ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত হবে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নথি, সিদ্ধান্ত ও দায়িত্ব নির্ধারণ করা, যাতে সত্য উদঘাটিত হয় এবং ভবিষ্যতে এমন অভিযোগের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
প্রিন্ট
আমার অনুসন্ধান রিপোর্ট 



















