আজ ২০২৬ সালের প্রারম্ভে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে যখন মেঘ আর রোদ্দুরের খেলা চলছে, তখন একটি নাম ধ্রুবতারার মতো জ্বলে থাকে—বেগম খালেদা জিয়া। বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং গণতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে পরিচিত এই মহীয়সী নারীর জীবন এক মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডি ও অদম্য সাহসের সংমিশ্রণ। তবে তার এই দীর্ঘ পথচলা যতটা না গৌরবের, তার চেয়েও বেশি জুলুম, নির্যাতন আর ষড়যন্ত্রের কাঁটায় বিদ্ধ।
গুজব বনাম নিষ্ঠুর বাস্তবতা
বিগত কয়েক বছরে বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে সবচেয়ে নোংরা যে খেলাটি হয়েছে, তা হলো তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে ছড়ানো বারবার ‘মৃত্যু গুজব’। যখনই তিনি হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থেকেছেন, তখনই একটি স্বার্থান্বেষী মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে জনমনে বিভ্রান্তি ও আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা করেছে। এই গুজবগুলো কেবল অমানবিকই ছিল না, বরং তা ছিল তার পরিবার এবং কোটি কোটি সমর্থকের হৃদয়ে রক্তক্ষরণের নামান্তর। অথচ বাস্তবতা ছিল আরও ভয়াবহ—উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার অধিকারটুকু পর্যন্ত তাকে দেওয়া হয়নি, যা আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসে এক চরম নিষ্ঠুরতা হিসেবে গণ্য হয়ে থাকবে।
জুলুম ও কারান্তরীণ জীবনের ট্র্যাজেডি
বেগম খালেদা জিয়ার ওপর জুলুমের শুরু কেবল ২০১৮ সালের কারাদণ্ড থেকে নয়; বরং ১৯৮২ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় থেকেই তিনি বারবার গৃহবন্দী ও কারান্তরীণ হয়েছেন। কিন্তু গত সাত-আট বছরে তাকে যে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, তা নজিরবিহীন। একটি পরিত্যক্ত ও স্যাঁতসেঁতে কারাগারে তাকে দীর্ঘকাল একাকী রাখা হয়েছে। তার বয়স ও শারীরিক অসুস্থতাকে বিবেচনা না করে বারবার আইনি মারপ্যাঁচে আটকে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের তিনবারের সফল প্রধানমন্ত্রীকে সামান্য চিকিৎসার জন্য আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়েছে—এটি আমাদের জাতীয় রাজনীতির এক কলঙ্কময় অধ্যায়।
ত্যাগের মহিমায় রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, খালেদা জিয়া কেবল একজন নেত্রী নন, তিনি একটি ত্যাগের নাম। তাকে নিশ্চিহ্ন করার যত বেশি চেষ্টা হয়েছে, তৃণমূলের মানুষের কাছে তিনি তত বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। শত জুলুম ও নির্যাতনের মুখেও তিনি আপসহীন থেকেছেন, দেশত্যাগ করেননি। তার এই ধৈর্য ও সহনশীলতা আগামী প্রজন্মের রাজনীতিবিদদের জন্য এক বড় শিক্ষা। তিনি প্রমাণ করেছেন, ক্ষমতা চলে গেলেও জনমানুষের ভালোবাসা থাকলে রাজনীতির ময়দানে টিকে থাকা যায়।
উপসংহার
গাজীপুরসহ সারা দেশের রাজপথের কর্মীদের কাছে ‘দেশনেত্রী’ কেবল একটি পদবি নয়, বরং আবেগ। তার বিরুদ্ধে হওয়া প্রতিটি ষড়যন্ত্র, প্রতিটি মিথ্যা মামলা এবং প্রতিটি জুলুমের স্মৃতি আজ ইতিহাসের কাঠগড়ায়। ক্ষমতার দাপটে হয়তো সত্যকে সাময়িকভাবে চাপা দেওয়া যায়, কিন্তু ইতিহাস যখন লেখা হয়, তখন খালেদা জিয়ার ত্যাগ আর লড়াইটিই ভাস্বর হয়ে উঠবে। ষড়যন্ত্র আর গুজব দিয়ে যাকে দমানো যায়নি, মৃত্যুবৎ পরিস্থিতির মুখেও যিনি নতি স্বীকার করেননি, তিনিই তো প্রকৃত জননেত্রী।
বেগম খালেদা জিয়ার এই শোকাবহ স্মৃতি আমাদের শিখিয়ে দেয় যে, ক্ষমতার চেয়ে মানুষের অধিকার বড় এবং শাসকের চেয়ে দেশপ্রেমিক বড়।
***চলে গেছেন প্রিয় নেত্রী, রেখে গেছেন লক্ষ কোটি মানুষের দীর্ঘশ্বাস। আপনার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।***
প্রিন্ট
ফারুক আহমদ গাজীপুর প্রতিনিধি 

















