নতুন সরকারের ভিআইপিদের নিরাপত্তায় এখন পর্যন্ত ১১১ জন গানম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এসবি থেকে। এর মধ্যে ১৩ জনের বিষয়ে ঘোর আপত্তি জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। তাদের বেশিরভাগের আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে জানা গেছে।
জাতীয় সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, চিফ হুইপ, হুইপ ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাসহ ভিআইপি ব্যক্তিদের গানম্যান নিয়োগে আগেই সতর্ক করেছিল নতুন সরকার।
নির্দেশনা ছিল, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যারা ভিআইপি ব্যক্তিদের নিরাপত্তায় গানম্যান হিসাবে নিয়োজিত ছিলেন, তাদের কাউকে যেন নয়া সরকারের কোনো ভিআইপির গানম্যান হিসাবে নিয়োগ দেওয়া না হয়। কিন্তু ওই নির্দেশ অমান্য করেই পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) থেকে নতুন সরকারের ভিআইপিদের গানম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, আওয়ামী আমলের গানম্যানদের পুনরায় নিয়োগ দিতে ছিল উচ্চ পর্যায়ের তদবির। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বিষয়টি অবগত করা হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে।
এটি আমলে নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইতোমধ্যেই ছয় ভিআইপির গানম্যান পরিবর্তন করা হয়েছে। আরও কয়েকজন ভিআইপির গানম্যান পরিবর্তনের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
জানতে চাইলে এসবিপ্রধান ও বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত আইজি সরদার নুরুল আমিন বুধবার বিকালে যুগান্তরকে বলেন, যেসব গানম্যান নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সেগুলো দেওয়া হয়েছিল আমি এসবিপ্রধান হিসাবে দায়িত্ব নেওয়ার আগে। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর ইতোমধ্যেই বিতর্কিত বেশির ভাগ গানম্যানকে সরিয়ে দিয়েছি। এ ক্ষেত্রে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে নতুন গানম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দ্রুতই সব বিতর্কিত গানম্যানকে সরিয়ে দেওয়া হবে।
সূত্র জানায়, নতুন সরকারের ভিআইপিদের নিরাপত্তায় এখন পর্যন্ত ১১১ জন গানম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এসবি থেকে। এদের মধ্যে ১৩ জনের বিষয়ে ঘোর আপত্তি জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত চিঠিও দেওয়া হয়েছে। গত ১৬ মার্চ দেওয়া ওই চিঠিতে আইজিপির পক্ষে স্বাক্ষর করেন পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (কনফিডেন্সিয়াল) কামরুল আহসান।
চিঠিতে বলা হয়েছে, ভিআইপিদের নিরাপত্তায় নিয়োগ দেওয়া গানম্যানের বেশির ভাগই আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পুলিশে যোগদান করেছেন। তাদের অনেকেই ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন। তারা আওয়ামী লীগ নেতাদের আত্মীয়স্বজন। তাদের পুলিশে নিয়োগ হয় আওয়ামী লীগের এমপিদের সুপারিশে। বিতর্কিত এই ব্যক্তিদের নতুন সরকারের ভিআইপিদের ক্লোজ প্রটেকশনের দায়িত্ব দেওয়ায় উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এতে রাষ্ট্রের স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহের গোপনীয়তা বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এক চিঠিতে বলা হয়, কনস্টেবল কাউছার আহমেদকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী (বর্তমানে জাতীয় সংসদের স্পিকার) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রমের গানম্যান হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কাউছার আহমেদ এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম টিটুর গানম্যান ছিলেন। পরে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের গানম্যান হিসাবে নিয়োগ পান। রিজওয়ানা হাসান এবং সদ্যসাবেক এসবিপ্রধান গোলাম রসুলের তদবিরে কাউসার আহমেদকে হাফিজ উদ্দিন আহমদের গানম্যান হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
কনস্টেবল তাসনীম আলম ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সাবেক মন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদারের গানম্যান ছিলেন। পরে তিনি প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা সমস্যা ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়াবলিসংক্রান্ত হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ ও প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানের গানম্যান নিযুক্ত হন। সদ্যসাবেক এসবিপ্রধান গোলাম রসুলের মাধ্যমে তদবির করিয়ে বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী (টেকনোক্র্যাট) ড. খলিলুর রহমান নিজেই তাসনীম আলমকে গানম্যান নিয়োগ দিয়েছেন বলে পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কনস্টেবল জাকির হোসেন আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্যোগ ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এনামুর রহমানের গানম্যান ছিলেন। ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সাবেক স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর গানম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়কমন্ত্রী আব্দুল আওয়াল মিন্টুর গানম্যান হিসাবে নিয়োজিত আছেন। এসবি প্রধান গোলাম রসুলের মাধ্যমে সাবেক স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এই নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
এএসআই বশির উল্লাহ আওয়ামী লীগ আমলের প্রতিমন্ত্রী শহীদুজ্জামান সরকারের গানম্যান ছিলেন। পরে তিনি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের গানম্যানের দায়িত্ব পান। বর্তমান সরকার আমলে বশির উল্লাহকে ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনুর গানম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই নিয়োগে তৎকালীন এসবিপ্রধান গোলাম রসুল সুপারিশ করেছিলেন বলে পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কনস্টেবল আশিকুল ইসলাম ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল আবু মোহাম্মদ আমিন উদ্দিনের গানম্যান ছিলেন। তাকে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের গানম্যান হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতেই তাকে এই পদে পদায়ন করা হয়েছে। এএসআই লুৎফুর রহমানও সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেলের গানম্যান ছিলেন। তাকেও মন্ত্রী আসাদুজ্জামানের গানম্যান হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এএসআই আব্দুর রহমান ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের গানম্যান ছিলেন। এরপর তিনি প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ড. সাইদুর রহমানের গানম্যান নিযুক্ত হন। বর্তমানে তাকে নৌপরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী রাজীব আহসানের গানম্যান হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সদ্যসাবেক এসবিপ্রধান গোলাম রসুল এবং অধ্যাপক ড. সাইদুর রহমানের (সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী) যৌথ সুপারিশে তার নিয়োগ কার্যকর হয়।
কনস্টেবল রাসেদুল হক সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর গানম্যান ছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তিনি প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিকবিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকীর গানম্যান নিযুক্ত হন। তাকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদের গানম্যান হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। লুৎফে সিদ্দিকী এবং একজন অতিরিক্ত আইজিপির সুপারিশের ভিত্তিতে তার পদায়ন নিশ্চিত করা হয় বলে পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে।
আরও জানিয়েছে, কনস্টেবল মিলন মাতব্বুর আওয়ামী আমলের প্রতিমন্ত্রী এনামুল হক শামীমের গানম্যান ছিলেন। তাকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীনের গানম্যান হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সদ্যবিদায়ি আইজিপি বাহারুল আলমের বিশেষ সুপারিশে এই পদায়ন হয়।
এএসআই কামরুজ্জামান ছিলেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা, কেএম খালিদ মাহমুদ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রভাবশালী উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের গানম্যান। তাকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরীর গানম্যান হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ইয়াসের খান চৌধুরী নিজেই তদবির করে ডিও লেটারের মাধ্যমে কামরুজ্জামানকে গানম্যান হিসাবে নিয়োগের ব্যবস্থা করেন বলে পুলিশ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
আরও বলা হয়েছে, এএসআই মো. নোমান আওয়ামী সরকারের বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল টিটুর গানম্যান ছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের গানম্যানও ছিলেন তিনি। তাকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এমএ মুহিতের গানম্যান হিসাবে পদায়ন করা হয়েছে। সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম এবং সাবেক এসবিপ্রধান গোলাম রসুলের সুপারিশে এই নিয়োগ দেওয়া হয়।
এএসআই মো. আব্দুল বারী ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের ছেলে রেজওয়ান আহমেদ তৌফিকের (সাবেক এমপি) গানম্যান। ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ক্যাপ্টেন (অব.) এবিএম তাজুল ইসলাম (সাবেক প্রতিমন্ত্রী), ২০২৪ সালে প্রতিমন্ত্রী ওয়াসিকা আয়েশা খান এবং ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায়ের গানম্যান ছিলেন। বর্তমানে তাকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিনের গানম্যান হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে সিটি এসবির ডিআইজি, সদ্যসাবেক এসবিপ্রধান গোলাম রসুলের পিএসের সুপারিশ ছিল। মাহদী আমিন নিজেও বারীকে গানম্যান হিসাবে নিয়োগ দেওয়ার পক্ষে ছিলেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এএসআই ইসমাইল বারী ছিলেন আওয়ামী লীগ আমলের মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদের গানম্যান। ডিআইজি, ভিআইপি প্রটেকশন অ্যান্ড প্রটোকলের সুপারিশের ভিত্তিতে তাকে বন, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক মন্ত্রী আবদুল আওয়াল মিন্টুর গানম্যান হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এদিকে গানম্যান নিয়োগসংক্রান্ত পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিবেদন পাওয়ার পর এসবির পক্ষ থেকে এরই মধ্যে যে ছয় ভিআইপির গ্যানম্যান পরিবর্তন করা হয়েছে তারা হলেন-সেতু ও নৌপরিবহণ প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান; সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন; তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী; স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এমএ মুহিত; প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন এবং পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক মন্ত্রী আবদুল আওয়াল মিন্টু।
যেসব গানম্যানকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে তারা হলেন-আব্দুর রহমান, মিলন মাতুব্বর, কামরুজ্জামান, মো. নোমান, আ. বারী এবং ইসমাইল বারী। এ ক্ষেত্রে নতুন গানম্যানরা হলেন-শরীফ মিয়া, আব্দুল গাফফার. এসএম খালিদ, সৈকত আলী, সবুজ হাসান এবং রফিকুল ইসলাম।
প্রিন্ট
নিজস্ব সংবাদ : 



















