দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে যা করা দরকার।।সরকারের

- আপডেট টাইম : ০৩:১৯:৪৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২২
- / ২১১ ৫০০০.০ বার পাঠক
সময়ের কন্ঠ রিপোর্ট।।
সপ্তাহ ধরে প্রধান আলোচিত বিষয় হওয়ার কথা ছিল নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন। কিন্তু সেটা মোটামুটি সাদামাটা অবস্থায়ই এগোচ্ছে। এর পরিবর্তে সংবাদমাধ্যমগুলোয় স্থান করে নিয়েছে অসহনীয় পণ্যের বাজার। এ নিয়ে সপ্তাহজুড়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যা থেকে সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বের বিষয়টি অনুভব করা যায়। নিত্যপণ্যের দামের বর্তমান লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে সব স্তরের মানুষ ভোগান্তিতে পড়লেও সীমিত আয়ের মানুষের জন্য তা অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। গরিব আছে সংকটে আর মধ্যবিত্তরা দিশেহারা। জীবনযাত্রার ব্যয় সংকুলান করার কোনো পথ তারা খুঁজে পাচ্ছে না।
বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার টানা তৃতীয় মেয়াদে দায়িত্বভার গ্রহণ করে ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি। সে হিসাবে বর্তমান সময়ে সরকারের মেয়াদ তিন বছর পেরিয়ে গেছে। এ তিন বছরের নিত্যপণের দাম বৃদ্ধির একটি তুলনামূলক চিত্র দেখা যাক। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ ( টিসিবি)-এর দেওয়া তথ্যমতে, ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে ভোজ্য তেল হিসাবে সয়াবিন তেলের দাম ছিল প্রতি লিটার ১০৪ টাকা। সেই সয়াবিন তেল আজ কিনতে হচ্ছে ১৬০ টাকায়। দাম বৃদ্ধির এ হার প্রায় ৫৪ শতাংশ। আরেকটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য হলো মসুর ডাল। তিন বছর আগে এর দাম ছিল কেজিপ্রতি ৫৫ টাকা। সেই ডাল আজকের বাজারে কিনতে হচ্ছে কেজিপ্রতি ৯৭ টাকা ৫০ পয়সায়। এর দাম বেড়েছে ৭৭ শতাংশেরও বেশি হারে। মোটা চাল হচ্ছে আমাদের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রধান খাদ্য। তিন বছরে সে চালের দাম ৪০ টাকা থেকে ৪৬ টাকা হয়েছে। দাম বৃদ্ধির এই হার ১৫ শতাংশ। চালের বিকল্প আটা। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে আটার দাম ছিল কেজিপ্রতি ২৮ টাকা ৫০ পয়সা। বর্তমানে বাজারে এর দাম ৩৪ টাকা ৫০ পয়সা। আটার দাম বেড়েছে প্রায় ২২ শতাংশ।
শিক্ষা পণ্যের কথা যদি ধরি, তাহলে দেখব, ২০ টাকার খাতা এখন ২৫ টাকায় কিনতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে শিক্ষা বাবদ ব্যয় বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। রান্নার জ্বালানি গ্যাস (এলপিজি) ২০১৯ সালে কিনেছি ১২ কেজির প্রতি সিলিন্ডার ৮৫০ টাকায়। এ ফেব্রুয়ারি মাসে তার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১২৪০ টাকা। গ্যাসের দাম বৃদ্ধির এই হার প্রায় ৪৬ শতাংশ। পানির অপর নাম জীবন। কিন্তু সেই পানির দাম বেড়ে জীবনকে করে তুলেছে দুর্বিষহ। ২০১৯ সালে ঢাকায় প্রতি হাজার লিটার পানির দাম নির্ধারিত ছিল ১১ টাকা ৫৭ পয়সা। আর ২০২২ সালে তা হয়েছে ১৫ টাকা ১৮ পয়সা। দাম বৃদ্ধির এই হার ৩১ শতাংশেরও বেশি। গত নভেম্বর থেকে পরিবহণের বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে আমাদের। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে ভাড়া সমন্বয় করা হয়েছে অসমভাবে। একটি পরিবহণের মোট ব্যয়ের ৪০ শতাংশ হলো জ্বালানি তেল। তেলের দাম বৃদ্ধিই যদি ভাড়া বৃদ্ধির কারণ হয়ে থাকে, তাহলে মোট ব্যয় বাড়ার কথা মাত্র ৮-৯ শতাংশ। কিন্তু সরকার ও মালিকপক্ষের সমঝোতায় সড়ক পরিবহণ ভাড়া বাড়ানো হয়েছে ২৭ শতাংশ আর লঞ্চ ভাড়া বাড়ানো হয়েছে প্রায় ৩৮ শতাংশ।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ২০২০ সালে ১৮টি সবজি বাজার পর্যবেক্ষণ করে বলেছে, সবজির দাম বেড়েছে ১০ শাতংশের বেশি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুতের দফায় দফায় দাম বৃদ্ধি। উল্লিখিত ব্যয়চিত্রের মধ্যে কোনো বিলাসদ্রব্যকে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। কোনো ধরনের বিনোদনকেও বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। স্রেফ প্রাকৃতিক অক্সিজেনের মাধ্যমে বেঁচে থাকা। হিসাব করে দেখা গেছে, অপরিহার্য ৮টি উপখাতে ব্যয় বৃদ্ধির হার গড়ে প্রায় ৩৬ শতাংশ। এর মানে হলো, যে ব্যক্তি তিন বছর আগে মাসে ৩০ হাজার টাকা আয় করে জীবন নির্বাহ করতেন, তার জীবনমান বজায় রাখতে এখন আয় করতে হবে প্রতিমাসে ৪০ হাজার ৮০০ টাকা। এ অতিরিক্ত ১০ হাজার ৮০০ টাকার সমাধান কে দেবে? সেই দুশ্চিন্তায় নিদ্রাহীন রাত কাটাচ্ছেন অনেকে। দুর্গতির এখানেই শেষ নয়; আগামী দিনে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে ১১৫ শতাংশ। বিদ্যুতের দাম ৬৬-৭৯ শতাংশ এবং পানির দাম ২০ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাবনাও আছে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস), পিপিআরসি ও সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর গবেষণা ও জরিপে দেখা গেছে, করোনাকালে দেশে দরিদ্রের সংখ্যা বেড়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায়। তাদের মতে, দারিদ্র্যের এই হার করোনাপূর্ব ২১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪১ শতাংশ হয়েছে। যদিও সরকার বারবারই বলছে, এ হার অনেক কম। কিন্তু সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) কাছে এর সমর্থনে কোনো তথ্য নেই। ২০২০ সালের অক্টোবরের বিবিএস-এর এক জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশের মানুষের আয় ২০ শতাংশ কমে গেছে। একদিকে আয় কমেছে ২০ শতাংশ, অপরদিকে ব্যয় বেড়েছে ৩৬ শতাংশ। তার মানে হলো, ১০০ টাকার আয় কমে ৮০ টাকা হয়েছে আর ১০০ টাকার ব্যয় বেড়ে ১৩৬ টাকা হয়েছে। আয়-ব্যয়ের ব্যধান হলো ৫৬ শতাংশ। এ বিশাল ঘাটতি মেটানোর উপায় সাধারণ মানুষের জানা আছে কি?
অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি একটি অতি স্বাভাবিক প্রবণতা। শায়েস্তা খানের আমলের এক টাকায় আট মন চাল এখন কেউ প্রত্যাশা করে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায়। তবে দাম বৃদ্ধির মাত্রাটা সহনীয় পর্যায়ে রাখা মঙ্গলজনক। সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে, আমাদের মূল্যস্ফীতির হার ৬ শতাংশের কম। কিন্তু প্রকৃত অর্থে তা অনেক বেশি। মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি যদি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে, তাহলে মূল্যস্ফীতির প্রভাব সহনীয় মাত্রায় থাকে। আমরা অনেক সময়ই বলে থাকি, করোনা-পরবর্তী সময়ে সারা বিশ্বেই পণ্যাদির দাম বেড়েছে, তা ঠিক। তবে ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে করোনাকালে অনেক দেশেই নগদ সহায়তার ব্যবস্থা ছিল। তাই এটি একটি অসম তুলনা।
তাহলে দাম বৃদ্ধির এ অবস্থায় সরকারের করণীয় কী? অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের কাছে বাজার নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার তিনটি-১. পণ্যের ওপর শুল্ক-কর কমানো; ২. খোলাবাজারে পণ্য বিক্রি বাড়ানো এবং ৩. বাজার তদারকি জোরদার করা। যে কারণে পণ্যের দাম বেড়েছে, এর অনেকটা দায় জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি। অথচ কৌশলগত এ পণ্যটির ওপর প্রায় ৩৪ শতাংশ করারোপ করা হয়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এ হার কমিয়ে বাজারদর সমন্বয় করা হয়েছে। সরকার খোলাবাজারে পণ্য বিক্রি করছে; কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এর আকার অনেক বেশি বিস্তৃত ও সহজ করা প্রয়োজন। আর শেষ হাতিয়ার হিসাবে বাজার তদারকির কাজটি খুব একটি কার্যকর নয় বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। অবৈধভাবে গড়ে ওঠা সিন্ডেকেটগুলোর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ব্যবস্থা সরকার নিতে পারছে না। এ দিকটাতে নজরদারি বাড়াতে হবে। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর মনে করেন, স্বল্প মেয়াদে দাম কিছুটা বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই। তবে জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অপচয় কমিয়ে আনতে পারলে সাশ্রয় করা সম্ভব। এর বাইরে আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা এখন চাহিদার চেয়ে দ্বিগুণ। তাতে অনেক বেসরকারি উৎপাদন প্ল্যান্টকে অলস বসিয়ে রেখে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকা। এ অপচয়ের কোনো প্রয়োজন নেই।
মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়