1. [email protected] : admi2017 :
রবিবার, ২৮ নভেম্বর ২০২১, ০২:০৭ অপরাহ্ন

নওগাঁর বাউল শিল্পী বীরেন্দ্রনাথ

  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০২০, ৩.৫২ পিএম
  • ৯২ বার পঠিত

নওগাঁর প্রতিনিধি।।
গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান, মিলিয়া বাউলা গান আর মূর্শিদী গাইতাম… আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম আমরা, আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম। কয়েক বছর আগেও হাতে একতারা আর বেহলা নিয়ে এমন শিরোনামের গান গাইতেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে। গানের সুর ও একতারার বাদ্যযন্ত্রটি দিয়ে বাউল বীরেন্দ্রনাথ তৈ (৭০) সুরের বৈচিত্র ফুঠিয়ে সবাইকে অন্যরকম পালাগান, কবিগান, জারিগান, শরিয়ত-মারিফত গান গেয়ে বিনোদন দিয়ে বেড়াতো সবাইকে।বয়সের ভার ও করোনার এই সংকটময় সময়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। করোনাকালে সরকারি-বেসরকারি অনেক মানবিক সহায়তা কর্মসূচি চালু থাকলেও বাউল শিল্পী বীরেন্দ্রনাথ তৈ এর ভাগ্যে সে ধরণের কোনো সহায়তাও জুটেনি। স্ত্রী পুষ্প রানীকে নিয়ে বর্তমানে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি।নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার ভীমপুর ইউনিয়ন শিকারপুর গ্রামের মৃত নরেন্দ্রনাথ তৈ এর ছেলে বাউলশিল্পী বীরেন্দ্রনাথ তৈ। চার ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার ছোট। দুই ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে এই বাউলশিল্পীর কয়েক বছর আগে বড় ছেলে ও দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। বড় ছেলে আলাদা ভাবে বসবাস করেন। সে কৃষি কাজ করে কোন রকম ভাবে জীবিকা নির্বাহ করছেন। সরেজমিনে মহাদেবপুর উপজেলার শিকারপুর গামে গিয়ে দেখা যায় বাউলশিল্পী বীরেন্দ্রনাথ তৈ বাড়ির পাশে বসে একা গান গাইছেন। একতারা-বেহুলার সমন্বয়ে নেই সেই আগের মত সুর। মাঝে মাঝে বয়স আর হতাশার কারনে গানের তাল ভুলে যাচ্ছেন। তবুও তার কাছে থেকে গান শুনতে চাইলে তার শিষ্য লাল ভানুকে নিয়ে  অনেক কষ্ট করে দুটি গান শুনিয়ে দিলেন।বাউলশিল্পী বীরেন্দ্রনাথ তৈ এর সাথে কথা হলে তিনি বলেন, আমার বয়স যখন ১৫/১৬ বছর তখন আমার গুরু নওগাঁ সদর উপজেলার বলিহার ইউনিয়ন এর গাজীপুর গ্রামের নূর মুহাম্মদ এর শিষ্য হিসাবে তার সাথে থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে একতারা বাজানো শরিয়ত, মারিফত, পালা গান, জারিগান ও কবিগান আয়ত্ব করি। আমার গুরু কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। গত বছরও দেশের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে অনুষ্টানে একতারা ও বেহলা হাতে গান পরিবেশন করেছি। কিন্তু ৬মাস যাবৎ খুবই শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকায় আগের মত গান গাইতে পারিনা। অন্যদিকে পুরো বছরটাই কেটে গেল করোনায় যার কারনে কোন অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার দাওয়াত পাইনি।বীরেন্দ্রনাথ তৈ বলেন, পরিবার নিয়ে অভাব-অনটনের মধ্যে দিয়ে অনেক কষ্টে দিনাতিপাত করছি। নেই কোন চাষ করার মত জমিজমা ও বাড়তি আয়ের উৎস। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি কয়েক বছর পূর্বে। এক ছেলে বিয়ের পর আলাদাভাবে থাকে।  আমি এক ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে ছোট্র একটি ঘরে বসবাস করি।তিনি বলেন, দুস্থ ও অসহায় শিল্পীদের সরকারি ও বে-সরকারীভাবে নানা ধরণের সহয়তা করা হলেও আমি কোন সহয়তা পাইনি। জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে কয়কে বার যোগাযোগ করেছিলাম কিন্তু সেখান থেকে কোন সহযোগিতা পাইনি। একটু সহযোগিতা পেলে কোন রকমভাবে খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকতে পারতাম। অন্যকোন কাজ করার মত শক্তি আমার দেহে নেই। আবার ফিরতে চাই আমার সেই অস্থিত্বে মিশে থাকা বাউল গানে। স্থানীয় শিকারপুর গামের বাসিন্দা নাদের আলী জানান, তিনি প্রায় ৫০বছর ধরে বাউগানের সাথে যুক্ত। সেই সাথে দেশের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শরিয়ত, মারিফত, পালা গান, জারিগান ও কবিগান শুনিয়ে হাজার হাজার দর্শকদের মন মাতিয়ে রাখতো। বর্তমানে তার বয়স হয়েছে, অনেক যার কারণে প্রায়ই অসুস্থ থাকেন। তাছাড়া করোনার কারণে সবখানে লোকসমাগম করে অনুষ্ঠান বন্ধ থাকায় তার আয় রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে।বাউল বীরেন্দ্রনাথ তৈ এর শিষ্য লাল বানু বলেন, আমি আমার ওস্তাদ এর সাথে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সহশিল্পী, গুরু- শিষ্য, শরিয়ত-মারুফতসহ নানান ধরণের পালাগান করে থাকি। বর্তমানে ওস্তাদ অসুস্থ্য, অন্যদিকে করোনার কারণে অনুষ্ঠান বন্ধ থাকায় মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। সমাজের বিত্তবান, সরকারি বেসরকারিভাবে যদি একটু সহায়তা পাওয়া যেত তবে কিছুটা হলে এমন দূর্দশা থেকে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হতো।বাউলদের নিয়ে সংগঠন নওগাঁ বাউল বাড়ির সভাপতি আলতাফ হোসেন বলেন, নওগাঁ জেলায় শতাধিক বাউলশিল্পী রয়েছে। অনেকেরই হয়তো মানবেতর জীবন কাটছে। বাউলরা গান-পরিবেশনার মধ্য দিয়ে সমাজের অসঙ্গতি তুলে ধরেন এবং মানুষকে বিনোদনের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক ও সামাজিক উন্নতি সাধনে উদ্ধুদ্ধ করে থাকেন। বাউলরা গানের মধ্য দিয়েই তাদের উর্পাজনের পথ খুঁজে পান। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে তারা কর্মহীন-বেকার। বিষয়টি অবশ্যই ভাবনায় নিতে হবে।বীরেন্দ্রনাথ তৈ বাউল বয়সের ভারে আজ অনেক অসহায় হয়ে পড়েছে। তাছাড়া করোনাভাইরাসের কারণে অনেকের আয় রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক বাউল অন্য পেশার সাথে যুক্ত থাকে যার কিছুটা আয় করে সংসার চলে কিন্তু বাউল বীরেন্দ্রনাথ তৈ এর বাড়তি আয়ের উৎস নেই । যার কারনে সে বর্তমানে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারিভাবেও এই করোনাকালে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। তাদের সহযোগিতা করতে হবে। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই এ বিষয়টি আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে।</জেলা কালচারাল অফিসার মো.আসাদুজ্জামান সরকার বলেন, চলতি বছরের জেলার দুস্থ শিল্পীদের তালিকা সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রনালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে। বাউল শিল্পী বীরেন্দ্রনাথ তৈ যদি আমাদের একটি আবেদন দেয় তবে আমরা তার আগামী বছর দুস্থ্য শিল্পীদের তালিকায় যুক্ত করে তার নাম পাঠিয়ে দিব যাতে তাকে যেন আর্থিকভাবে সহায়তা করা হয়।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

themesbazarsomoyer14
© All rights reserved  2019-2021 somoyerkontha.com