ঢাকা ০৯:৩৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬, ২৭ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo রামুর শ্রীমুরায় পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান: সিএনজির ড্রাইভিং সিটের নিচে মিলল ৩০ হাজার ইয়াবা, কারবারি গ্রেপ্তার। Logo ইরানের হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিগুলো ‘অকার্যকর’ Logo আবু সাঈদ ভেবেছিলেন সামনে মানুষ, তবে ‘তারা ছিল অমানুষ’ Logo এরা হলুদ সাংবাদিকতা ছাড়বে কখন, প্রশ্ন জামায়াত আমিরের Logo প্রত্যেক শহীদের রক্তের মূল্য আদায় করা হবে: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা Logo ১০ এপ্রিল: ২২ ক্যারেট স্বর্ণের ভরি কত? Logo আশুলিয়ায় ডিবি পুলিশের অভিযানে হিরোইনসহ মাদক ব্যবসা ডিবি পুলিশের অভিযানে হিরোইনসহ মাদক ব্যবসায়ী সুজন ও সোহাগ গ্রেফতার Logo পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে পিসিআইইউ মিডিয়া ক্লাবের ৩য় কার্যনির্বাহী কমিটির শপথ গ্রহণ সম্পন্ন Logo উপকূলে তালগাছ বাড়াতে প্রশিক্ষণ, বনায়নে নতুন উদ্যোগ মোংলায় Logo কসবা-আখাউড়ায় বহুদিনের স্বপ্ন বাস্তবায়ন: শুরু হচ্ছে দুটি মিনি স্টেডিয়ামের নির্মাণকাজ

আবু সাঈদ ভেবেছিলেন সামনে মানুষ, তবে ‘তারা ছিল অমানুষ’

চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের প্রথম শহীদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলায় দুই পুলিশ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। গতকাল বৃহস্পতিবার এ রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ে তিনজনকে যাবজ্জীবন, পাঁচজনকে ১০ বছর, আটজনকে পাঁচ বছর এবং ১১ জনকে তিন বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। দণ্ডিতদের মধ্যে পুলিশ কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিসহ শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী, চিকিৎসক ও ছাত্রলীগ নেতা রয়েছেন।

বহুল প্রতীক্ষিত এ রায় ঘোষণার শুরুতেই ট্রাইব্যুনাল বলে, আবু সাঈদ জুলাই বিপ্লবের প্রথম শহীদ। তিনি দুহাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়েছিলেন। ভেবেছিলেন তার সামনে মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, তারা তাকে মারবে না। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেননি—মানুষগুলো অমানুষ হয়ে গিয়েছিল।

গতকাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল জনাকীর্ণ আদালতে এ রায় ঘোষণা করে। প্যানেলের অপর সদস্যরা হলেন বিচারক মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক এএসআই আমির হোসেন এবং কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন—রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক সহকারী কমিশনার (কোতোয়ালি জোন) আরিফুজ্জামান জীবন, তাজহাট থানার সাবেক ওসি রবিউল ইসলাম নয়ন এবং বেরোবির সাবেক ক্যাম্প ইনচার্জ বিভূতিভূষণ রায় মাধব।

১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. হাসিবুর রশিদ, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার মনিরুজ্জামান, বেরোবির গণিত বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান, লোকপ্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডল এবং ছাত্রলীগের বেরোবি শাখার সভাপতি পোমেল বড়ুয়াকে।

পাঁচ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা

হলেন—রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ নূর আলম পাটোয়ারী, সাবেক উপকমিশনার আবু মারুফ হোসেন, বেরোবির সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল, বেরোবি ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইমরান চৌধুরী ও মাসুদুল হাসান, বেরোবির অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মাহাবুবার রহমান এবং স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি ডা. সারোয়ার হোসেন।

তিন বছরের সাজা পাওয়া আসামিরা হলেন—বেরোবির সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার হাফিজুর রহমান, সেকশন অফিসার মনিরুজ্জামান পলাশ, বেরোবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহাফুজুর রহমান শামীম, সহসভাপতি ফজলে রাব্বী, সহসভাপতি আখতার হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক সেজান আহম্মেদ, সাংগঠনিক সম্পাদক ধনঞ্জয় কুমার, দপ্তর সম্পাদক বাবুল হোসেন, বেরোবির এমএলএসএস নুরুন্নবী মণ্ডল ও একেএম আমির হোসেন এবং সিকিউরিটি গার্ড নূর আলম মিয়া।

এছাড়া বেরোবি প্রক্টর অফিসের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী আনোয়ার পারভেজ আপেলের হাজতবাসকে সাজার মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে বলে গণ্য করে আদালত।

আবু সাঈদ হত্যা মামলার ৩০ আসামির মধ্যে ছয়জন বর্তমানে গ্রেপ্তার আছেন। তারা হলেন—এএসআই আমির হোসেন, বেরোবির সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়, ছাত্রলীগ নেতা ইমরান চৌধুরী, রাফিউল হাসান রাসেল এবং আনোয়ার পারভেজ। গতকাল তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। অপর ২৪ আসামি পলাতক রয়েছেন।

রায়ের পর্যবেক্ষণে যা বলা হয়েছে

গতকাল দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এজলাসে আসে। এরপর ট্রাইব্যুনালের সদস্য-২ বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর একটি অংশ পড়ে শোনান। তিনি বলেন, আবু সাঈদ হত্যা মামলার ৩০ আসামির বিরুদ্ধে লক্ষ্যভিত্তিক, পদ্ধতিগত ও ধারাবাহিক হত্যার অংশ হিসেবে হত্যাকাণ্ড সংঘটনে প্ররোচনা, সহায়তা, রাজনৈতিক নির্যাতন, ব্যক্তিগত দায়, সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি ও যৌথ অপরাধ সংঘটনের দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায় আনা হয়েছে।

অপর অংশে সদস্য-১ মঞ্জুরুল বাছিদ বলেন, ‘প্রসিকিউশন ২৫ জন সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করেছে। কয়েকজন সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে আসামিদের বিরুদ্ধে অপরাধের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন। আমরা সাক্ষীদের প্রতিটি শব্দ যাচাই-বাছাই করে দেখেছি। তিনজন বিচারক একমত হয়ে এ রায় দিয়েছেন। আসামিদের বিরুদ্ধে আরোপিত সব সাজা যুগপৎ চলতে থাকবে।’

মামলার বিচার প্রক্রিয়া

গত ৫ মার্চ রায়ের জন্য ৯ এপ্রিল দিন ধার্য করে ট্রাইব্যুনাল। এর আগে গত ২৭ জানুয়ারি এ মামলার যুক্তিতর্ক শেষে রায়ের দিন নির্ধারণের জন্য অপেক্ষমাণ রাখে ট্রাইব্যুনাল। গত ২১ জানুয়ারি প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক শুরু হয়ে শেষ হয় ২৫ জানুয়ারি। গত বছরের ২৭ আগস্ট এ মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। ৬ আগস্ট ৩০ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল। পলাতক আসামিদের পক্ষে ২২ জুলাই স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী হিসেবে চারজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। অভিযোগ আমলে নেওয়া হয় ৩০ জুন। ২৪ জুন চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে প্রতিবেদন জমা দেন তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা।

রায়ের পর আসামিদের ‘জয় বাংলা’ স্লোগান

রায়ের পর আসামিদের এজলাস থেকে বের করার সময় তারা দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি শুরু করেন। এ সময় তারা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে বলেন, আমরা এ রায় মানি না। আমাদের ফাঁসানো হয়েছে, আমরা নির্দোষ। মৃত্যুদণ্ড পাওয়া এএসআই আমির হোসেন বলেন, আমি পুলিশের চাকরি করি, হুকুমের গোলাম। আমাকে কেন মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আমার সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে। আমি এ রায় মানি না।

চিফ প্রসিকিউটরের প্রতিক্রিয়া

চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেছেন, শহীদ আবু সাঈদ দুহাত প্রসারিত করে বুক চিতিয়ে দিয়ে বুলেটকে আলিঙ্গন করে দেশকে স্বৈরাচারের কবল থেকে রক্ষা করেছিলেন। এর বিনিময়ে আজ বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আজ (গতকাল) এ হত্যার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। দুজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। রায়ে প্রসিকিউশন আপাতত সন্তুষ্ট। তবে রায়ের কপি পাওয়ার পর যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজন মনে করলে আপিল করা হবে।

আবু সাঈদের পরিবারের অসন্তোষ

রংপুর প্রতিনিধি জানান, রায়ের পর অসন্তোষ প্রকাশ করেছের শহীদ আবু সাঈদের পরিবারের সদস্যরা। সন্তুষ্ট হননি আবু সাঈদের সহপাঠীরাও।

গতকাল দুপুরে রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার বাবুনপুর গ্রামের নিজ বাড়িতে আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন বলেন, আরো লোকের ফাঁসি হওয়া উচিত ছিল। ছাত্রলীগ নেতা পোমেল বড়ুয়া আমার ছেলেকে খুব মারপিট করেছে, গলাও টিপে ধরেছিল। এদের অনেক কঠিন বিচার হওয়া উচিত ছিল।

শহীদ আবু সাঈদের মা মনোয়ারা বেগম সাংবাদিকদের জানান, এ রায়ে আমরা খুশি নই। আরো বেশি আসামিকে শাস্তি দিলে আমরা খুশি হতাম। এ মামলায় যারা পলাতক রয়েছে, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

আবু সাঈদের ভাই রমজান আলী বলেন, আমাদের মনে হয়েছে রংপুরে পুলিশের যারা কর্মকর্তা ছিলেন, তাদের কম সাজা হয়েছে। ছাত্রলীগ সভাপতি পোমেল বড়ুয়ারও ফাঁসি হওয়ার দরকার ছিল। আরেক ভাই আবুল হোসেন বলেন, রায়ের কপি পেলে প্রসিকিউশনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে আপিল করব।

আবু সাঈদের সহযোদ্ধা শামসুর রহমান সুমন বলেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আমাদের ভাইয়ের হত্যার রায় প্রকাশ হয়েছে। আমরা দেখেছি, গুরুতর অপরাধ করা আসামিদের অনেককে লঘু শাস্তি দেওয়া হয়েছে। আদালত পুনরায় বিবেচনা করবে বলে প্রত্যাশা করছি। একই সঙ্গে রায়ে যাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে, তাদের রায় দ্রুত কার্যকর করার দাবি জানাচ্ছি।

আপিল করবে আসামিপক্ষ

এদিকে, রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু। তিনি আনোয়ার পারভেজ, এএসআই আমির হোসেন এবং কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়ের পক্ষে লড়েছেন। তিনি বলেন, রায়ের সংক্ষিপ্ত অংশ অনুযায়ী আনোয়ার পারভেজ একটি অভিযোগে হাজতবাসকালীন দণ্ড পেলেও বাকি অভিযোগ থেকে খালাস পেয়েছেন। আমির হোসেন ও সুজন চন্দ্র পাঁচটি অভিযোগের মধ্যে চারটি থেকে খালাস পেলেও একটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। রায়ের কপি পেলে আমরা আপিল করব।


প্রিন্ট
ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

রামুর শ্রীমুরায় পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান: সিএনজির ড্রাইভিং সিটের নিচে মিলল ৩০ হাজার ইয়াবা, কারবারি গ্রেপ্তার।

আবু সাঈদ ভেবেছিলেন সামনে মানুষ, তবে ‘তারা ছিল অমানুষ’

আপডেট সময় ১২:১২:৫৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬

চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের প্রথম শহীদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলায় দুই পুলিশ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। গতকাল বৃহস্পতিবার এ রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ে তিনজনকে যাবজ্জীবন, পাঁচজনকে ১০ বছর, আটজনকে পাঁচ বছর এবং ১১ জনকে তিন বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। দণ্ডিতদের মধ্যে পুলিশ কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিসহ শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী, চিকিৎসক ও ছাত্রলীগ নেতা রয়েছেন।

বহুল প্রতীক্ষিত এ রায় ঘোষণার শুরুতেই ট্রাইব্যুনাল বলে, আবু সাঈদ জুলাই বিপ্লবের প্রথম শহীদ। তিনি দুহাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়েছিলেন। ভেবেছিলেন তার সামনে মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, তারা তাকে মারবে না। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেননি—মানুষগুলো অমানুষ হয়ে গিয়েছিল।

গতকাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল জনাকীর্ণ আদালতে এ রায় ঘোষণা করে। প্যানেলের অপর সদস্যরা হলেন বিচারক মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক এএসআই আমির হোসেন এবং কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন—রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক সহকারী কমিশনার (কোতোয়ালি জোন) আরিফুজ্জামান জীবন, তাজহাট থানার সাবেক ওসি রবিউল ইসলাম নয়ন এবং বেরোবির সাবেক ক্যাম্প ইনচার্জ বিভূতিভূষণ রায় মাধব।

১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. হাসিবুর রশিদ, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার মনিরুজ্জামান, বেরোবির গণিত বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান, লোকপ্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডল এবং ছাত্রলীগের বেরোবি শাখার সভাপতি পোমেল বড়ুয়াকে।

পাঁচ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা

হলেন—রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ নূর আলম পাটোয়ারী, সাবেক উপকমিশনার আবু মারুফ হোসেন, বেরোবির সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল, বেরোবি ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইমরান চৌধুরী ও মাসুদুল হাসান, বেরোবির অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মাহাবুবার রহমান এবং স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি ডা. সারোয়ার হোসেন।

তিন বছরের সাজা পাওয়া আসামিরা হলেন—বেরোবির সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার হাফিজুর রহমান, সেকশন অফিসার মনিরুজ্জামান পলাশ, বেরোবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহাফুজুর রহমান শামীম, সহসভাপতি ফজলে রাব্বী, সহসভাপতি আখতার হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক সেজান আহম্মেদ, সাংগঠনিক সম্পাদক ধনঞ্জয় কুমার, দপ্তর সম্পাদক বাবুল হোসেন, বেরোবির এমএলএসএস নুরুন্নবী মণ্ডল ও একেএম আমির হোসেন এবং সিকিউরিটি গার্ড নূর আলম মিয়া।

এছাড়া বেরোবি প্রক্টর অফিসের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী আনোয়ার পারভেজ আপেলের হাজতবাসকে সাজার মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে বলে গণ্য করে আদালত।

আবু সাঈদ হত্যা মামলার ৩০ আসামির মধ্যে ছয়জন বর্তমানে গ্রেপ্তার আছেন। তারা হলেন—এএসআই আমির হোসেন, বেরোবির সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়, ছাত্রলীগ নেতা ইমরান চৌধুরী, রাফিউল হাসান রাসেল এবং আনোয়ার পারভেজ। গতকাল তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। অপর ২৪ আসামি পলাতক রয়েছেন।

রায়ের পর্যবেক্ষণে যা বলা হয়েছে

গতকাল দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এজলাসে আসে। এরপর ট্রাইব্যুনালের সদস্য-২ বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর একটি অংশ পড়ে শোনান। তিনি বলেন, আবু সাঈদ হত্যা মামলার ৩০ আসামির বিরুদ্ধে লক্ষ্যভিত্তিক, পদ্ধতিগত ও ধারাবাহিক হত্যার অংশ হিসেবে হত্যাকাণ্ড সংঘটনে প্ররোচনা, সহায়তা, রাজনৈতিক নির্যাতন, ব্যক্তিগত দায়, সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি ও যৌথ অপরাধ সংঘটনের দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায় আনা হয়েছে।

অপর অংশে সদস্য-১ মঞ্জুরুল বাছিদ বলেন, ‘প্রসিকিউশন ২৫ জন সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করেছে। কয়েকজন সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে আসামিদের বিরুদ্ধে অপরাধের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন। আমরা সাক্ষীদের প্রতিটি শব্দ যাচাই-বাছাই করে দেখেছি। তিনজন বিচারক একমত হয়ে এ রায় দিয়েছেন। আসামিদের বিরুদ্ধে আরোপিত সব সাজা যুগপৎ চলতে থাকবে।’

মামলার বিচার প্রক্রিয়া

গত ৫ মার্চ রায়ের জন্য ৯ এপ্রিল দিন ধার্য করে ট্রাইব্যুনাল। এর আগে গত ২৭ জানুয়ারি এ মামলার যুক্তিতর্ক শেষে রায়ের দিন নির্ধারণের জন্য অপেক্ষমাণ রাখে ট্রাইব্যুনাল। গত ২১ জানুয়ারি প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক শুরু হয়ে শেষ হয় ২৫ জানুয়ারি। গত বছরের ২৭ আগস্ট এ মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। ৬ আগস্ট ৩০ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল। পলাতক আসামিদের পক্ষে ২২ জুলাই স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী হিসেবে চারজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। অভিযোগ আমলে নেওয়া হয় ৩০ জুন। ২৪ জুন চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে প্রতিবেদন জমা দেন তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা।

রায়ের পর আসামিদের ‘জয় বাংলা’ স্লোগান

রায়ের পর আসামিদের এজলাস থেকে বের করার সময় তারা দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি শুরু করেন। এ সময় তারা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে বলেন, আমরা এ রায় মানি না। আমাদের ফাঁসানো হয়েছে, আমরা নির্দোষ। মৃত্যুদণ্ড পাওয়া এএসআই আমির হোসেন বলেন, আমি পুলিশের চাকরি করি, হুকুমের গোলাম। আমাকে কেন মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আমার সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে। আমি এ রায় মানি না।

চিফ প্রসিকিউটরের প্রতিক্রিয়া

চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেছেন, শহীদ আবু সাঈদ দুহাত প্রসারিত করে বুক চিতিয়ে দিয়ে বুলেটকে আলিঙ্গন করে দেশকে স্বৈরাচারের কবল থেকে রক্ষা করেছিলেন। এর বিনিময়ে আজ বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আজ (গতকাল) এ হত্যার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। দুজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। রায়ে প্রসিকিউশন আপাতত সন্তুষ্ট। তবে রায়ের কপি পাওয়ার পর যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজন মনে করলে আপিল করা হবে।

আবু সাঈদের পরিবারের অসন্তোষ

রংপুর প্রতিনিধি জানান, রায়ের পর অসন্তোষ প্রকাশ করেছের শহীদ আবু সাঈদের পরিবারের সদস্যরা। সন্তুষ্ট হননি আবু সাঈদের সহপাঠীরাও।

গতকাল দুপুরে রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার বাবুনপুর গ্রামের নিজ বাড়িতে আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন বলেন, আরো লোকের ফাঁসি হওয়া উচিত ছিল। ছাত্রলীগ নেতা পোমেল বড়ুয়া আমার ছেলেকে খুব মারপিট করেছে, গলাও টিপে ধরেছিল। এদের অনেক কঠিন বিচার হওয়া উচিত ছিল।

শহীদ আবু সাঈদের মা মনোয়ারা বেগম সাংবাদিকদের জানান, এ রায়ে আমরা খুশি নই। আরো বেশি আসামিকে শাস্তি দিলে আমরা খুশি হতাম। এ মামলায় যারা পলাতক রয়েছে, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

আবু সাঈদের ভাই রমজান আলী বলেন, আমাদের মনে হয়েছে রংপুরে পুলিশের যারা কর্মকর্তা ছিলেন, তাদের কম সাজা হয়েছে। ছাত্রলীগ সভাপতি পোমেল বড়ুয়ারও ফাঁসি হওয়ার দরকার ছিল। আরেক ভাই আবুল হোসেন বলেন, রায়ের কপি পেলে প্রসিকিউশনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে আপিল করব।

আবু সাঈদের সহযোদ্ধা শামসুর রহমান সুমন বলেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আমাদের ভাইয়ের হত্যার রায় প্রকাশ হয়েছে। আমরা দেখেছি, গুরুতর অপরাধ করা আসামিদের অনেককে লঘু শাস্তি দেওয়া হয়েছে। আদালত পুনরায় বিবেচনা করবে বলে প্রত্যাশা করছি। একই সঙ্গে রায়ে যাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে, তাদের রায় দ্রুত কার্যকর করার দাবি জানাচ্ছি।

আপিল করবে আসামিপক্ষ

এদিকে, রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু। তিনি আনোয়ার পারভেজ, এএসআই আমির হোসেন এবং কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়ের পক্ষে লড়েছেন। তিনি বলেন, রায়ের সংক্ষিপ্ত অংশ অনুযায়ী আনোয়ার পারভেজ একটি অভিযোগে হাজতবাসকালীন দণ্ড পেলেও বাকি অভিযোগ থেকে খালাস পেয়েছেন। আমির হোসেন ও সুজন চন্দ্র পাঁচটি অভিযোগের মধ্যে চারটি থেকে খালাস পেলেও একটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। রায়ের কপি পেলে আমরা আপিল করব।


প্রিন্ট