ইরানে নতুন নেতা নির্বাচন করেছেন নেতৃস্থানীয় সভা
ইরানের ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের সংবিধানের ধারা ১০৭ অনুযায়ী ইরানের নেতা নির্বাচন করা হয় ‘মজলিসে খোবরেগান-ই রাহবারি’ বা রাহবার নির্বাচনের বিশেষজ্ঞ পরিষদ নামে একটি পরিষদের মাধ্যমে। এটি ৮৮ জন প্রতিনিধি নিয়ে গঠিত, যাদের সবাই মুজতাহিদ এবং ধর্মীয় প-িত। তাদের মূল দায়িত্ব হলো রাহবার নির্বাচন করা এবং তার কার্যক্রম ও তার অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর নজরদারি করা।
এ সংসদের প্রতিনিধিরা সরাসরি জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হন। তাই ইরানের নেতা নির্বাচন একটি নির্দিষ্ট নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং ব্যবস্থার মাধ্যমে হয়ে থাকে এবং এটি মনোনীত পদ্ধতি নয়। এই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক এবং ভোটের উপর ভিত্তিশীল, যার অর্থ হলো, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তি অর্থাৎ রাহবারের নির্বাচনে জনগণের ভূমিকা রয়েছে এবং তিনি নির্বাচনের মাধ্যমে নির্ধারিত হন।
ইরানের উপর মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক হামলার অমানবিক ঘটনার ফলে ১৪০৪ সালের ৯ই এসফান্দ (২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) হযরত আয়াতুল্লাহ আল-উজমা খামেনেয়ি শহিদ হন, যেটা অবৈধভাবে এবং আন্তর্জাতিক আইন ও সংস্থার নীতির বিপরীতে সংঘটিত হয়েছিল। মজলিসে খোবরেগান-ই রাহবারি বিদ্যমান বিকল্পগুলো পর্যালোচনা করতে শুরু করে এবং অবশেষে আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুজতবা খামেনেয়িকে নতুন রাহবার এবং ১৩৫৭ ফারসি সালে (১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দ) ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর তৃতীয় নেতা নির্বাচন করে।
আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুজতবা খামেনেয়ি যদিও শহিদ রাহবার হযরত আয়াতুল্লাহ আল-উজমা ইমাম খামেনেয়ির সন্তান, তবুও তাঁকে নতুন নেতা হিসেবে নির্বাচিত করা কোনও পারিবারিক সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে হয়নি এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সংবিধানের ধারার ভিত্তিতে নির্বাচনের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়েছে। বিপ্লবের শহিদ নেতা নিজেও পরবর্তী নেতার নির্বাচন সংক্রান্ত কোনো পরামর্শ বা সুপারিশ করেননি। মজলিসে খোবরেগান-ই রাহবারির কিছু প্রতিনিধি যাঁরা তাঁকে ভবিষ্যৎ নেতা সম্পর্কে মতামত জানানোর জন্য অনুরোধ করেছিলেন, শহিদ রাহবার কোনো মতামত দেননি এবং বলেছিলেন যে, মজলিসে খোবরেগান-ই রাহবারির প্রতিনিধিরা নিজেরা ভোট দান এবং সংবিধানের নিয়ম অনুযায়ী ভবিষ্যৎ নেতাকে নির্বাচন করবেন।
ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নেতার শর্তাবলি ও বৈশিষ্ট্যসমূহ ইরানের সংবিধানের ৫ এবং ১০৯ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে। মজলিসে খোবরেগান-ই রাহবারির প্রতিনিধিরা প্রার্থীদের এই শর্তাবলি অনুসরণ করে সেই প্রার্থীকে নেতা নির্বাচিত করেন, যিনি সর্বোচ্চ শর্তাবলি ও বৈশিষ্ট্যসমূহের অধিকারী। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শহিদ নেতা আয়াতুল্লাহ আল-উজমা খামেনেয়ির নির্বাচনও ১৩৬৮ হিজরি শামসি (১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দ) সালে একই প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থা অনুসারে সম্পন্ন হয়েছিল।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্তাবলি ও বৈশিষ্ট্যসমূহ যা সংবিধানের ধারা ৫ এবং ১০৯ অনুযায়ী রাহবারের জন্য নির্ধারিত হয়েছে, তা জ্ঞানগত, নৈতিক এবং প্রশাসনিক ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয়েছে। জ্ঞানগত দিক থেকে, ইরানের নেতা যেহেতু ইসলামি রাজনৈতিক ব্যবস্থার অধীনে আছেন, তাই তাঁকে ইসলামি বিজ্ঞানে (ফিকহ ও উসুল-এ ফিকহ- ফিকাহশাস্ত্র ও ফিকাহশাস্ত্রের মূলনীত) একজন মুজতাহিদ এবং ফকীহ হতে হবে, যিনি ইসলামি আইনশাস্ত্রের মূলনীতি ও বিধি-বিধান নির্ণয়ে সক্ষম। আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুজতবা খামেনেয়ি এই বৈশিষ্ট্যগুলো ধারণ করেছেন এবং দীর্ঘদিন ধরে তেহরান ও কোম (ইরানের ইসলামি শিক্ষার কেন্দ্র)
নৈতিক শর্তাবলি ও বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নেতাকে ন্যায়পরায়ণ, ধর্মপ্রাণ, আত্মসংযমী ও কামনা-বাসনার প্রভাবমুক্ত, বিনয়ী, সরল জীবনযাপনকারী এবং অর্থনৈতিকভাবে সৎ হতে হবে। এই বৈশিষ্ট্যগুলো নেতাকে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে গড়ে তোলে এবং জনগণের সমর্থন ও সহযোগিতা নিশ্চিত করে। আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনেয়ি এই দিক থেকেও সংবিধানে উল্লেখিত শর্তাবলি এবং বৈশিষ্ট্যাবলি ধারণ করেন এবং মাজলেসে খোবরেগান-ই রাহবারির সকল প্রতিনিধি, এমনকি যাঁরা তাঁকে সরাসরি দেখেছেন এবং চিনেছেন, এ কথা স্বীকার করেন।
ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নেতার বৈশিষ্ট্য এবং শর্তের তৃতীয় দিক হলো প্রশাসনিক ও কার্যনির্বাহী ক্ষমতা, এবং নেতাকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহকে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচালনা করতে সক্ষম হতে হবে। আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুজতবা খামেনেয়ি বহু বছর বিপ্লবের শহিদ রাহবারের পাশে দেশের বড় বড় প্রশাসনিক কাজকর্মে নিয়োজিত ছিলেন এবং বলা যায়, তিনি রাহবারের প্রথম সহকারী হিসেবে বিবেচিত হতেন। এই কারণে তিনি দেশের প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্কিত সকল অভ্যন্তরীণ ও বহির্বিশ্বের কার্যক্রমের বিষয়ে বিজ্ঞতা অর্জন করেছেন এবং মাজলিসে খোবরেগান-ই রাহবারির সদস্যদের মতে, তিনি দেশকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে সক্ষম।
আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুজতবা খামেনেয়িকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের তৃতীয় নেতা হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে গত কয়েকদিনে দেশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও দায়িত্বশীলরা, দেশের অভিজাত ব্যক্তিবর্গ এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠী তাঁর নির্বাচনের প্রতি ব্যাপকভাবে সাড়া দেখিয়েছেন। এই সকল স্তরের মানুষ নতুন নেতাকে গ্রহণ করেছেন, সন্তুষ্ট ও আনন্দিত হয়েছেন এবং আনুগত্য ও অনুসরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এই প্রক্রিয়া ও পরিস্থিতি ইরানের ভবিষ্যতের জন্য শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বের আভাস দেয়। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শত্রুদের বিরোধ এবং নেতার উত্তরাধিকারমূলক হওয়ার মতো ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক সংশয় সত্ত্বেও, যা উপরের ব্যাখ্যার মাধ্যমে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়েছে, শহিদ নেতার পথ অব্যাহত থাকবে এবং ইরানি জাতি ও দেশ উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে এগিয়ে চলবে।
লেখক: কালচারাল কাউন্সেলর, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের দূতাবাস, ঢাকা।
বিভাগ : সম্পাদকীয়
প্রিন্ট
নিজস্ব সংবাদ : 



















