ঢাকা ০১:৩০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২৩ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo নাসিরনগরে সেনাবাহিনীর অভিযানে ভারতীয় অবৈধ পণ্য জব্দ Logo প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসিরউদ্দিন Logo দ্য উইকে সাক্ষাৎকার জামায়াত প্রগতিশীল ও মধ্যপন্থি ইসলামী রাজনৈতিক দল: ডা. শফিকুর রহমান Logo নির্বাচন বানচালে ভারতের নীলনকশা, বড় হামলার ছক ওয়াসিম সিদ্দিকী Logo নাসিরনগরে সেনাবাহিনীর অভিযানে ভারতীয় অবৈধ পণ্য জব্দ Logo দিনাজপুরের ফুলবাড়ী সীমান্ত এলাকা থেকে বিদেশি গান ও মাদকদ্রব্য উদ্ধার করেছে বিজিবি Logo ২০ বছর পর বরিশালে জনসভা মঞ্চে তারেক রহমান। Logo আমাদের সাইবার টিম তাদের গলা টিপে ধরেছে: জামায়াত আমির Logo পুতিনের তেল নাকি ট্রাম্পের ছাড়—কোন দিকে ঝুঁকবে ভারত? Logo নির্বাচনে দায়িত্ব পালনে ১০৫১ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ

নির্বাচন বানচালে ভারতের নীলনকশা, বড় হামলার ছক ওয়াসিম সিদ্দিকী

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় ১০:১১:৩০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২ ১৮৪৪.০০০ বার পড়া হয়েছে

আসন্ন সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে দেশকে অস্থিতিশীল করার একটি পরিকল্পিত, বহুস্তরীয় নীলনকশা বাস্তবায়নের আশঙ্কার কথা জানাচ্ছে একাধিক নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সূত্র। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, এই পরিকল্পনার লক্ষ্য নির্বাচন বানচাল করা, প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলোর রাজনৈতিক সংঘাতকে রক্তক্ষয়ী রূপ দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কিত করে তোলা।

নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই নীলনকশার সঙ্গে সীমান্ত পারের অপশক্তি, পলাতক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিদের একটি নেটওয়ার্ক এবং উগ্রবাদী গ্রুপের সম্পৃক্ততার তথ্য মিলেছে। অনলাইন প্ল্যাটফরমে পরিকল্পিত উসকানি, ভুয়া ভিডিও ও বিভ্রান্তিকর পোস্ট ছড়িয়ে মাঠপর্যায়ে উত্তেজনা বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থের বিনিময়ে সন্ত্রাসী গ্রুপ নামানোর আশঙ্কাও রয়েছে।

গোয়েন্দা তথ্যে উঠে এসেছে, নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার জন্য একটি ‘ক্রিটিক্যাল ফেজ’ নির্ধারণ করা হয়েছে। ওই সময়ের মধ্যে টার্গেট কিলিং, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি, রাজনৈতিক সমাবেশে হামলা এবং অনলাইন প্ল্যাটফরমে গুজব ছড়িয়ে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চালানোর আশঙ্কা রয়েছে।

গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, প্রথম ধাপে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি এবং জামায়াতের মধ্যে ছোট-খাটো সংঘর্ষকে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। অনুপ্রবেশকারী সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে দুই পক্ষের মিছিলে হামলা, টার্গেট কিলিং এবং নারী নিপীড়নের মতো স্পর্শকাতর ইস্যু ব্যবহার করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

বিশেষ করে অনলাইনে গুজব ছড়িয়ে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের পরস্পরের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ করে তোলার কৌশল ইতিমধ্যেই বিভিন্ন স্থানে দৃশ্যমান হচ্ছে বলে গোয়েন্দা বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। এ ক্ষেত্রে সারা দেশের ৮৭টি আসনে সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে বলে দুটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যে উঠে এসেছে। রাজধানীর ঢাকার একাধিক আসনও রয়েছে এই তালিকায়। পরিস্থিতির সার্বিক মূল্যায়নে দুই দলকেই সংযমী ও সতর্কভাবে নির্বাচনি প্রচার চালানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে নিরাপত্তা দুটি সংস্থার পক্ষ থেকে। কারণ, যে কোনো কারণে নির্বাচন বানচাল হলে ভারতীয় মিডিয়া ও দেশীয় দোসরদের মাধ্যমে একটি বয়ান দাঁড় করানো হতে পারে—আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন সম্ভব নয়।

‘র’-এর তৈরি জেএমবির ১০৩ সদস্য নিয়ে উচ্চ সতর্কতা

সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, আওয়ামী শাসনামলে তৎকালীন প্রশাসনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদতে এবং ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’–এর সক্রিয় সহযোগিতায় এক শ্রেণির তরুণকে উগ্রবাদী হিসেবে গড়ে তোলার প্রক্রিয়া চলে। পরিকল্পনাগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছিল, যাতে ‘র’–এর সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া কঠিন হয়। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিক ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ইসলামপ্রিয় তরুণদের আবেগকে কাজে লাগাতে তাদের অনুপ্রাণিত করা হয়। ফিলিস্তিন, কাশ্মীর ও ভারতের মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের দৃশ্য দেখিয়ে তাদের মানসিকভাবে প্রভাবিত করা হয়—এই বয়ান প্রতিষ্ঠা করতে যে গণতন্ত্র ‘কুফরি ব্যবস্থা’ এবং মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো প্রকৃত ইসলামের পথে বাধা। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর মদতে তৈরি জেএমবির প্রশিক্ষিত কিছু বিপথগামী তরুণকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। জেএমবির ১০৩ জন পলাতক সদস্যকে নিয়ে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ইতিমধ্যে উচ্চ সতর্কবার্তা জারি করেছে।

এই ‘ব্রেইন–ওয়াশড’ তরুণদের বোঝানো হয়েছে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া মানেই কাফির–মুশরিকদের দোসর হওয়া। হাসিনা সরকারের আমলে যাদের ‘জঙ্গি’ হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল, তাদেরই এখন বর্তমান সরকারকে অস্থিতিশীল করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো—ভারতে পলাতক কিছু সাবেক পুলিশ ও সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা এই পুরো নেটওয়ার্কের সমন্বয় করছেন। ভারতের মাটি ব্যবহার করে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণদের উচ্চতর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে বলেও গোয়েন্দা তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। প্রশিক্ষিত ঘাতকরা বাংলাদেশে প্রবেশ করে বড় ধরনের হামলার চেষ্টা চালাতে পারে—এমন আশঙ্কায় নিরাপত্তা সংস্থাগুলো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এছাড়া যারা এদেশে রয়েছে, তাদেরও বিভিন্ন স্থানে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এই তরুণদের মধ্যে অধিকাংশই আওয়ামী শাসনামলে ‘র’-এর তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণ পাওয়া তরুণ। বর্তমান সরকারকে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের দোসর আখ্যা দিয়ে তাদের উজ্জীবিত করা হচ্ছে।

সম্প্রতি ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকা কেরানীগঞ্জের একটি মাদরাসায় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে আওয়ামী আমলে প্রভাবিত তরুণদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। যেভাবে ভারতীয় ‘র’-এর তত্ত্বাবধানে ২০০৫ সালে বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে দেশব্যাপী বোমা হামলার মতো ঘটনা ঘটানো হয়। ‘জেএমবি এবং বাংলা ভাই’-এর মতো সংগঠন গড়ে তোলা হয় মোটিভেটেড প্রক্রিয়ায়। নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সূত্র আমার দেশ’র সঙ্গে আলাপকালে ভারতীয় ‘র’-এর প্লট নিয়ে উদ্বেগের কথা জানাতে গিয়ে এসব বিষয় ব্যাখ্যা করেন।

এছাড়াও গত বছর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস কঠোর নির্দেশ দিয়েছিলেন হিযবুত তাহরিরের মতো নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করতে। কিন্তু ওই কঠোর নির্দেশনা সত্ত্বেও এসব বিষয়ে গ্রেপ্তার অভিযানে সফলতা খুব বেশি আসেনি। সে সময় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-এর ডিবির দায়িত্বে ছিলেন রেজাউল করিম মল্লিক। নানা সমালোচনার মুখে তাকে সরিয়ে দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে আরো ভালো স্থানে প্রাইজ পোস্টিং দেওয়া হয়। করা হয় ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি। শেখ হাসিনার শাসনামলে তৎকালীন সরকারের ব্রেইন ওয়াশ করা কিছু বিপথগামী তরুণকে আলোর পথে নিয়ে আসার কোনো প্রক্রিয়া নেওয়া হয়নি। উপরন্তু ঢাকা রেঞ্জের আওতাধীন সাভার, কেরানীগঞ্জ, গোপালগঞ্জসহ ঘনবসতিপূর্ণ ও দুর্গম এলাকায় ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী মনোভাবাপন্ন অনেক তরুণকেও ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে। এসব বিষয়ে ঢাকা রেঞ্জ প্রধানের দায়িত্বশীলতা নিয়ে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে ব্যাপকভাবে উষ্মা প্রকাশ করা হয়েছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০০৫ সালের সিরিজ বোমা হামলার ঘটনার চেয়েও বর্তমান প্লট অনেক বেশি আধুনিক, ছদ্মবেশী ও প্রযুক্তিনির্ভর। এই নেটওয়ার্কের সদস্যরা সাধারণ যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছে না। ইউটিউব, টেলিগ্রামসহ এনক্রিপ্টেড প্ল্যাটফর্মে যোগাযোগ রেখে অপারেশনের সময় সম্পূর্ণ মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন রাখছে। ধর্মীয় ও সামাজিক মূলধারার সঙ্গেও তারা বিচ্ছিন্ন থাকে—যা শনাক্তকরণকে আরো কঠিন করে তুলছে। ‘লোন উলফ’ কৌশলে পরিচালিত এই হামলাকারীদের চিহ্নিত করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দিল্লিতে ‘আনহোলি অ্যালায়েন্স’ ও নাটের গুরুরা

জুলাই গণহত্যার নির্দেশ দাতারা বর্তমানে দিল্লি ও কলকাতার বিভিন্ন ‘সেফ হাউসে’ অবস্থান করে এই বিশৃঙ্খলার রিমোট কন্ট্রোল নাড়ছেন। বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো নিশ্চিত হয়েছে যে, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান এবং সাবেক এসবি প্রধান মনিরুল ইসলাম এই ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে রয়েছেন। সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের মধ্যে ডিজিএফআই-এর সাবেক মহাপরিচালক লে. জেনারেল (অব.) আকবর হোসেন, সাইফুল আলম, হামিদুল হক এবং সাবেক সামরিক সচিব মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদসহ একদল পলাতক কর্মকর্তা এই ‘আনহোলি অ্যালায়েন্স’ বা অপশক্তির জোট গঠন করেছেন। এদের মূল লক্ষ্য যে কোনো মূল্যে আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনকে বানচাল করে দলটিকে নিয়ে নির্বাচন করা।

জুলাইয়ের নেতাদের টার্গেট করা হতে পারে

গোয়েন্দা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জুলাই আন্দোলনের অন্যতম আইকন, উদীয়মান নেতা নাহিদ ইসলাম ও নাসিরউদ্দীন পাটওয়ারীসহ তরুণ নেতৃত্বের ওপর টার্গেট কিলিং চালিয়ে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে একদিকে জুলাই বিপ্লবের ফ্রন্টলাইন নেতৃত্বশূন্য হবে, অন্যদিকে এই হত্যার দায়ভার প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক পক্ষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সহজ হবে। একে ‘এক ঢিলে একাধিক পাখি’ মারার পরিকল্পনা বলে মনে করা হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্ট নেতাদের বক্তব্য ও কর্মসূচিতে বাড়তি সংযম এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা জোরদারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সীমান্তের ওপার থেকে অস্থিরতার ব্লু-প্রিন্ট

ভারতের মাটি ব্যবহার করে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত একদল তরুণকে উচ্চতর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যারা বিস্ফোরক ও ড্রোন নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে। বিশেষ করে যশোর, সিলেট ও ময়মনসিংহ সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্র ও প্রশিক্ষিত ঘাতক ঢোকানোর আশঙ্কায় এসব এলাকায় ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করা হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনের ভেতরে এখনো যারা পলাতক কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন, তাদের শনাক্ত করতে গঠন করা হয়েছে বিশেষ মনিটরিং সেল। সাভার, কেরানীগঞ্জ ও গোপালগঞ্জের দুর্গম এলাকায় গোপন প্রশিক্ষণের অভিযোগও খতিয়ে দেখছে যৌথ বাহিনী।

নিরাপত্তা বহর ও প্রযুক্তির নজরদারি

নির্বাচনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার এক অভূতপূর্ব ও নিশ্ছিদ্র বলয় গড়ে তুলেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সেনাবাহিনী, পুলিশ, আনসার, র‍্যাব, বিজিবি ও কোস্ট গার্ডসহ বিভিন্ন বাহিনীর নয় লাখের বেশি সদস্য সারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় মোতায়েন থাকবে। এর মধ্যে এক লাখ সেনা সদস্য সরাসরি মাঠে থাকবেন। এছাড়া ১ লাখ ৪৯ হাজার পুলিশ এবং ৫ লাখ ৭৬ হাজার আনসার সদস্য ভোটকেন্দ্র ও এর আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবেন। বিজিবি ও কোস্ট গার্ড মূলত সীমান্ত ও উপকূলীয় অঞ্চলের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা ও ড্রোন নজরদারির পাশাপাশি ডগ স্কোয়াড এবং পুলিশের বডি-ওর্ন ক্যামেরার মাধ্যমে প্রতিটি মুহূর্ত সরাসরি মনিটরিং করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষণে নাশকতার প্রধান চারটি দিক চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে বিএনপি, জামায়াত ও ছাত্রনেতাদের ওপর ‘টার্গেট কিলিং’-এর শঙ্কা মোকাবিলায় স্পেশাল এসকর্ট ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। সীমান্তের ওপার থেকে প্রশিক্ষিত ঘাতক ও বিস্ফোরক অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ড্রোন ও থার্মাল ইমেজিং ক্যামেরা ব্যবহার করছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী। এছাড়া এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি করা ভুয়া ভিডিও ও অডিওর মাধ্যমে সাইবার যুদ্ধ রুখতে এনটিএমসি এবং সাইবার ইউনিটকে পূর্ণ সক্রিয় রাখা হয়েছে। ককটেল বিস্ফোরণ বা অগ্নিসংযোগের মতো অভ্যন্তরীণ নাশকতা দমনে যৌথ বাহিনীর ‘চিরুনি অভিযান’অব্যাহত রয়েছে।

ডিজিটাল প্ল্যাটফরমে ‘মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’ ও গুজব প্রতিরোধ

ষড়যন্ত্রের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে ডিজিটাল প্ল্যাটফরমকে। গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, ইউটিউব ও টেলিগ্রাম ব্যবহার করে ‘ভোটকেন্দ্রে হামলা’ বা ‘ব্যালট ছিনতাই’-এর মতো ভুয়া ও বানোয়াট ভিডিও প্রচার করে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে রাজনৈতিক নেতাদের কণ্ঠস্বর নকল করে তৈরি করা ‘ফ্যাব্রিকেটেড’ অডিও ক্লিপের মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। এ ধরনের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ রুখতে পুনর্গঠিত এনটিএমসি এবং সাইবার ক্রাইম ইউনিট সার্বক্ষণিক কাজ করছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সতর্কতা ও নিরাপত্তা বাহিনীর পরামর্শ

দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য ইতিমধ্যে তাদের নাগরিকদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছে। এর আগে ভারত সরকার তার দেশের বাংলাদেশে দায়িত্বরত কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো তথ্য যাচাই ছাড়া শেয়ার না করা এবং অপরিচিত পার্সেল বা সন্দেহজনক গতিবিধি দেখলে দ্রুত ‘৯৯৯’ বা নিকটস্থ যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে জানানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে। বিশেষ করে নির্বাচনের আগের ৭২ ঘণ্টাকে ‘ক্রিটিক্যাল’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

আমার দেশ-এর সঙ্গে আলাপকালে নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা অভিমত দিয়েছেন, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী দুটি জোটের পরস্পরের প্রতি সহনশীলতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত প্রস্তুতির সামনে যে কোনো বিদেশি নীলনকশা ব্যর্থ হতে বাধ্য। সার্বিকভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যাতে বড় ধরনের অবনতি না হয়, সে বিষয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) এবং পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) থেকে। ইতিমধ্যে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে এই সংস্থা দুটি থেকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, প্রতিটি জেলায় জেলা প্রশাসক যেহেতু রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং উপজেলা পর্যায়ে ইউএনও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন সেজন্য তাদের নেতৃত্বে পুলিশ, র‌্যাব, সেনাবাহিনী, বিজিবি, আনসারসহ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় করে প্রতিটি উপজেলা ও জেলায় দ্রুত যে কোনো বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় একক কমান্ড থাকলে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সহজ হয়।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান ড. ওমর ফারুক বলেন, এই নীলনকশা নস্যাৎ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ তৎপর থাকতে হবে। নিয়মিত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। দেশের সীমান্ত এলাকাগুলোকে অ্যালার্ট করতে হবে। পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানোর অংশ হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, ভুয়া ভিডিও ও উসকানিমূলক বার্তা যাচাই ছাড়া শেয়ার না করা, সন্দেহজনক কিছু দেখলে দ্রুত জানানো— এসবই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ। ষড়যন্ত্রের রিমোট কন্ট্রোল যেখানেই থাকুক, সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগের দৃঢ়তা ও সম্মিলিত সচেতনতাই শেষ পর্যন্ত এই অস্থিরতার ব্লু–প্রিন্ট ব্যর্থ করে দিতে পারে বলে অভিমত তার।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, সরকার সব বাস্তবতা মাথায় রেখে অভূতপূর্ব নিরাপত্তা প্রস্তুতি নিয়েছে। সেনাবাহিনী, পুলিশ, আনসার, র‍্যাব, বিজিবি ও কোস্ট গার্ডসহ নয় লাখের বেশি সদস্য মোতায়েন থাকবে নির্বাচনের নিরাপত্তায়।


প্রিন্ট
ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

নাসিরনগরে সেনাবাহিনীর অভিযানে ভারতীয় অবৈধ পণ্য জব্দ

নির্বাচন বানচালে ভারতের নীলনকশা, বড় হামলার ছক ওয়াসিম সিদ্দিকী

আপডেট সময় ১০:১১:৩০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আসন্ন সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে দেশকে অস্থিতিশীল করার একটি পরিকল্পিত, বহুস্তরীয় নীলনকশা বাস্তবায়নের আশঙ্কার কথা জানাচ্ছে একাধিক নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সূত্র। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, এই পরিকল্পনার লক্ষ্য নির্বাচন বানচাল করা, প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলোর রাজনৈতিক সংঘাতকে রক্তক্ষয়ী রূপ দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কিত করে তোলা।

নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই নীলনকশার সঙ্গে সীমান্ত পারের অপশক্তি, পলাতক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিদের একটি নেটওয়ার্ক এবং উগ্রবাদী গ্রুপের সম্পৃক্ততার তথ্য মিলেছে। অনলাইন প্ল্যাটফরমে পরিকল্পিত উসকানি, ভুয়া ভিডিও ও বিভ্রান্তিকর পোস্ট ছড়িয়ে মাঠপর্যায়ে উত্তেজনা বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থের বিনিময়ে সন্ত্রাসী গ্রুপ নামানোর আশঙ্কাও রয়েছে।

গোয়েন্দা তথ্যে উঠে এসেছে, নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার জন্য একটি ‘ক্রিটিক্যাল ফেজ’ নির্ধারণ করা হয়েছে। ওই সময়ের মধ্যে টার্গেট কিলিং, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি, রাজনৈতিক সমাবেশে হামলা এবং অনলাইন প্ল্যাটফরমে গুজব ছড়িয়ে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চালানোর আশঙ্কা রয়েছে।

গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, প্রথম ধাপে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি এবং জামায়াতের মধ্যে ছোট-খাটো সংঘর্ষকে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। অনুপ্রবেশকারী সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে দুই পক্ষের মিছিলে হামলা, টার্গেট কিলিং এবং নারী নিপীড়নের মতো স্পর্শকাতর ইস্যু ব্যবহার করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

বিশেষ করে অনলাইনে গুজব ছড়িয়ে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের পরস্পরের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ করে তোলার কৌশল ইতিমধ্যেই বিভিন্ন স্থানে দৃশ্যমান হচ্ছে বলে গোয়েন্দা বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। এ ক্ষেত্রে সারা দেশের ৮৭টি আসনে সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে বলে দুটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যে উঠে এসেছে। রাজধানীর ঢাকার একাধিক আসনও রয়েছে এই তালিকায়। পরিস্থিতির সার্বিক মূল্যায়নে দুই দলকেই সংযমী ও সতর্কভাবে নির্বাচনি প্রচার চালানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে নিরাপত্তা দুটি সংস্থার পক্ষ থেকে। কারণ, যে কোনো কারণে নির্বাচন বানচাল হলে ভারতীয় মিডিয়া ও দেশীয় দোসরদের মাধ্যমে একটি বয়ান দাঁড় করানো হতে পারে—আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন সম্ভব নয়।

‘র’-এর তৈরি জেএমবির ১০৩ সদস্য নিয়ে উচ্চ সতর্কতা

সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, আওয়ামী শাসনামলে তৎকালীন প্রশাসনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদতে এবং ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’–এর সক্রিয় সহযোগিতায় এক শ্রেণির তরুণকে উগ্রবাদী হিসেবে গড়ে তোলার প্রক্রিয়া চলে। পরিকল্পনাগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছিল, যাতে ‘র’–এর সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া কঠিন হয়। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিক ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ইসলামপ্রিয় তরুণদের আবেগকে কাজে লাগাতে তাদের অনুপ্রাণিত করা হয়। ফিলিস্তিন, কাশ্মীর ও ভারতের মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের দৃশ্য দেখিয়ে তাদের মানসিকভাবে প্রভাবিত করা হয়—এই বয়ান প্রতিষ্ঠা করতে যে গণতন্ত্র ‘কুফরি ব্যবস্থা’ এবং মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো প্রকৃত ইসলামের পথে বাধা। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর মদতে তৈরি জেএমবির প্রশিক্ষিত কিছু বিপথগামী তরুণকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। জেএমবির ১০৩ জন পলাতক সদস্যকে নিয়ে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ইতিমধ্যে উচ্চ সতর্কবার্তা জারি করেছে।

এই ‘ব্রেইন–ওয়াশড’ তরুণদের বোঝানো হয়েছে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া মানেই কাফির–মুশরিকদের দোসর হওয়া। হাসিনা সরকারের আমলে যাদের ‘জঙ্গি’ হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল, তাদেরই এখন বর্তমান সরকারকে অস্থিতিশীল করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো—ভারতে পলাতক কিছু সাবেক পুলিশ ও সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা এই পুরো নেটওয়ার্কের সমন্বয় করছেন। ভারতের মাটি ব্যবহার করে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণদের উচ্চতর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে বলেও গোয়েন্দা তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। প্রশিক্ষিত ঘাতকরা বাংলাদেশে প্রবেশ করে বড় ধরনের হামলার চেষ্টা চালাতে পারে—এমন আশঙ্কায় নিরাপত্তা সংস্থাগুলো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এছাড়া যারা এদেশে রয়েছে, তাদেরও বিভিন্ন স্থানে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এই তরুণদের মধ্যে অধিকাংশই আওয়ামী শাসনামলে ‘র’-এর তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণ পাওয়া তরুণ। বর্তমান সরকারকে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের দোসর আখ্যা দিয়ে তাদের উজ্জীবিত করা হচ্ছে।

সম্প্রতি ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকা কেরানীগঞ্জের একটি মাদরাসায় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে আওয়ামী আমলে প্রভাবিত তরুণদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। যেভাবে ভারতীয় ‘র’-এর তত্ত্বাবধানে ২০০৫ সালে বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে দেশব্যাপী বোমা হামলার মতো ঘটনা ঘটানো হয়। ‘জেএমবি এবং বাংলা ভাই’-এর মতো সংগঠন গড়ে তোলা হয় মোটিভেটেড প্রক্রিয়ায়। নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সূত্র আমার দেশ’র সঙ্গে আলাপকালে ভারতীয় ‘র’-এর প্লট নিয়ে উদ্বেগের কথা জানাতে গিয়ে এসব বিষয় ব্যাখ্যা করেন।

এছাড়াও গত বছর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস কঠোর নির্দেশ দিয়েছিলেন হিযবুত তাহরিরের মতো নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করতে। কিন্তু ওই কঠোর নির্দেশনা সত্ত্বেও এসব বিষয়ে গ্রেপ্তার অভিযানে সফলতা খুব বেশি আসেনি। সে সময় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-এর ডিবির দায়িত্বে ছিলেন রেজাউল করিম মল্লিক। নানা সমালোচনার মুখে তাকে সরিয়ে দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে আরো ভালো স্থানে প্রাইজ পোস্টিং দেওয়া হয়। করা হয় ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি। শেখ হাসিনার শাসনামলে তৎকালীন সরকারের ব্রেইন ওয়াশ করা কিছু বিপথগামী তরুণকে আলোর পথে নিয়ে আসার কোনো প্রক্রিয়া নেওয়া হয়নি। উপরন্তু ঢাকা রেঞ্জের আওতাধীন সাভার, কেরানীগঞ্জ, গোপালগঞ্জসহ ঘনবসতিপূর্ণ ও দুর্গম এলাকায় ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী মনোভাবাপন্ন অনেক তরুণকেও ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে। এসব বিষয়ে ঢাকা রেঞ্জ প্রধানের দায়িত্বশীলতা নিয়ে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে ব্যাপকভাবে উষ্মা প্রকাশ করা হয়েছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০০৫ সালের সিরিজ বোমা হামলার ঘটনার চেয়েও বর্তমান প্লট অনেক বেশি আধুনিক, ছদ্মবেশী ও প্রযুক্তিনির্ভর। এই নেটওয়ার্কের সদস্যরা সাধারণ যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছে না। ইউটিউব, টেলিগ্রামসহ এনক্রিপ্টেড প্ল্যাটফর্মে যোগাযোগ রেখে অপারেশনের সময় সম্পূর্ণ মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন রাখছে। ধর্মীয় ও সামাজিক মূলধারার সঙ্গেও তারা বিচ্ছিন্ন থাকে—যা শনাক্তকরণকে আরো কঠিন করে তুলছে। ‘লোন উলফ’ কৌশলে পরিচালিত এই হামলাকারীদের চিহ্নিত করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দিল্লিতে ‘আনহোলি অ্যালায়েন্স’ ও নাটের গুরুরা

জুলাই গণহত্যার নির্দেশ দাতারা বর্তমানে দিল্লি ও কলকাতার বিভিন্ন ‘সেফ হাউসে’ অবস্থান করে এই বিশৃঙ্খলার রিমোট কন্ট্রোল নাড়ছেন। বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো নিশ্চিত হয়েছে যে, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান এবং সাবেক এসবি প্রধান মনিরুল ইসলাম এই ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে রয়েছেন। সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের মধ্যে ডিজিএফআই-এর সাবেক মহাপরিচালক লে. জেনারেল (অব.) আকবর হোসেন, সাইফুল আলম, হামিদুল হক এবং সাবেক সামরিক সচিব মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদসহ একদল পলাতক কর্মকর্তা এই ‘আনহোলি অ্যালায়েন্স’ বা অপশক্তির জোট গঠন করেছেন। এদের মূল লক্ষ্য যে কোনো মূল্যে আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনকে বানচাল করে দলটিকে নিয়ে নির্বাচন করা।

জুলাইয়ের নেতাদের টার্গেট করা হতে পারে

গোয়েন্দা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জুলাই আন্দোলনের অন্যতম আইকন, উদীয়মান নেতা নাহিদ ইসলাম ও নাসিরউদ্দীন পাটওয়ারীসহ তরুণ নেতৃত্বের ওপর টার্গেট কিলিং চালিয়ে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে একদিকে জুলাই বিপ্লবের ফ্রন্টলাইন নেতৃত্বশূন্য হবে, অন্যদিকে এই হত্যার দায়ভার প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক পক্ষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সহজ হবে। একে ‘এক ঢিলে একাধিক পাখি’ মারার পরিকল্পনা বলে মনে করা হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্ট নেতাদের বক্তব্য ও কর্মসূচিতে বাড়তি সংযম এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা জোরদারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সীমান্তের ওপার থেকে অস্থিরতার ব্লু-প্রিন্ট

ভারতের মাটি ব্যবহার করে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত একদল তরুণকে উচ্চতর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যারা বিস্ফোরক ও ড্রোন নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে। বিশেষ করে যশোর, সিলেট ও ময়মনসিংহ সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্র ও প্রশিক্ষিত ঘাতক ঢোকানোর আশঙ্কায় এসব এলাকায় ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করা হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনের ভেতরে এখনো যারা পলাতক কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন, তাদের শনাক্ত করতে গঠন করা হয়েছে বিশেষ মনিটরিং সেল। সাভার, কেরানীগঞ্জ ও গোপালগঞ্জের দুর্গম এলাকায় গোপন প্রশিক্ষণের অভিযোগও খতিয়ে দেখছে যৌথ বাহিনী।

নিরাপত্তা বহর ও প্রযুক্তির নজরদারি

নির্বাচনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার এক অভূতপূর্ব ও নিশ্ছিদ্র বলয় গড়ে তুলেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সেনাবাহিনী, পুলিশ, আনসার, র‍্যাব, বিজিবি ও কোস্ট গার্ডসহ বিভিন্ন বাহিনীর নয় লাখের বেশি সদস্য সারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় মোতায়েন থাকবে। এর মধ্যে এক লাখ সেনা সদস্য সরাসরি মাঠে থাকবেন। এছাড়া ১ লাখ ৪৯ হাজার পুলিশ এবং ৫ লাখ ৭৬ হাজার আনসার সদস্য ভোটকেন্দ্র ও এর আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবেন। বিজিবি ও কোস্ট গার্ড মূলত সীমান্ত ও উপকূলীয় অঞ্চলের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা ও ড্রোন নজরদারির পাশাপাশি ডগ স্কোয়াড এবং পুলিশের বডি-ওর্ন ক্যামেরার মাধ্যমে প্রতিটি মুহূর্ত সরাসরি মনিটরিং করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষণে নাশকতার প্রধান চারটি দিক চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে বিএনপি, জামায়াত ও ছাত্রনেতাদের ওপর ‘টার্গেট কিলিং’-এর শঙ্কা মোকাবিলায় স্পেশাল এসকর্ট ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। সীমান্তের ওপার থেকে প্রশিক্ষিত ঘাতক ও বিস্ফোরক অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ড্রোন ও থার্মাল ইমেজিং ক্যামেরা ব্যবহার করছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী। এছাড়া এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি করা ভুয়া ভিডিও ও অডিওর মাধ্যমে সাইবার যুদ্ধ রুখতে এনটিএমসি এবং সাইবার ইউনিটকে পূর্ণ সক্রিয় রাখা হয়েছে। ককটেল বিস্ফোরণ বা অগ্নিসংযোগের মতো অভ্যন্তরীণ নাশকতা দমনে যৌথ বাহিনীর ‘চিরুনি অভিযান’অব্যাহত রয়েছে।

ডিজিটাল প্ল্যাটফরমে ‘মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’ ও গুজব প্রতিরোধ

ষড়যন্ত্রের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে ডিজিটাল প্ল্যাটফরমকে। গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, ইউটিউব ও টেলিগ্রাম ব্যবহার করে ‘ভোটকেন্দ্রে হামলা’ বা ‘ব্যালট ছিনতাই’-এর মতো ভুয়া ও বানোয়াট ভিডিও প্রচার করে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে রাজনৈতিক নেতাদের কণ্ঠস্বর নকল করে তৈরি করা ‘ফ্যাব্রিকেটেড’ অডিও ক্লিপের মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। এ ধরনের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ রুখতে পুনর্গঠিত এনটিএমসি এবং সাইবার ক্রাইম ইউনিট সার্বক্ষণিক কাজ করছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সতর্কতা ও নিরাপত্তা বাহিনীর পরামর্শ

দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য ইতিমধ্যে তাদের নাগরিকদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছে। এর আগে ভারত সরকার তার দেশের বাংলাদেশে দায়িত্বরত কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো তথ্য যাচাই ছাড়া শেয়ার না করা এবং অপরিচিত পার্সেল বা সন্দেহজনক গতিবিধি দেখলে দ্রুত ‘৯৯৯’ বা নিকটস্থ যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে জানানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে। বিশেষ করে নির্বাচনের আগের ৭২ ঘণ্টাকে ‘ক্রিটিক্যাল’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

আমার দেশ-এর সঙ্গে আলাপকালে নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা অভিমত দিয়েছেন, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী দুটি জোটের পরস্পরের প্রতি সহনশীলতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত প্রস্তুতির সামনে যে কোনো বিদেশি নীলনকশা ব্যর্থ হতে বাধ্য। সার্বিকভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যাতে বড় ধরনের অবনতি না হয়, সে বিষয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) এবং পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) থেকে। ইতিমধ্যে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে এই সংস্থা দুটি থেকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, প্রতিটি জেলায় জেলা প্রশাসক যেহেতু রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং উপজেলা পর্যায়ে ইউএনও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন সেজন্য তাদের নেতৃত্বে পুলিশ, র‌্যাব, সেনাবাহিনী, বিজিবি, আনসারসহ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় করে প্রতিটি উপজেলা ও জেলায় দ্রুত যে কোনো বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় একক কমান্ড থাকলে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সহজ হয়।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান ড. ওমর ফারুক বলেন, এই নীলনকশা নস্যাৎ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ তৎপর থাকতে হবে। নিয়মিত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। দেশের সীমান্ত এলাকাগুলোকে অ্যালার্ট করতে হবে। পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানোর অংশ হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, ভুয়া ভিডিও ও উসকানিমূলক বার্তা যাচাই ছাড়া শেয়ার না করা, সন্দেহজনক কিছু দেখলে দ্রুত জানানো— এসবই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ। ষড়যন্ত্রের রিমোট কন্ট্রোল যেখানেই থাকুক, সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগের দৃঢ়তা ও সম্মিলিত সচেতনতাই শেষ পর্যন্ত এই অস্থিরতার ব্লু–প্রিন্ট ব্যর্থ করে দিতে পারে বলে অভিমত তার।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, সরকার সব বাস্তবতা মাথায় রেখে অভূতপূর্ব নিরাপত্তা প্রস্তুতি নিয়েছে। সেনাবাহিনী, পুলিশ, আনসার, র‍্যাব, বিজিবি ও কোস্ট গার্ডসহ নয় লাখের বেশি সদস্য মোতায়েন থাকবে নির্বাচনের নিরাপত্তায়।


প্রিন্ট