চট্টগ্রাম বন্দর দেশের আমদানি–রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার এবং জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। দেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের সিংহভাগ এই বন্দরের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বন্দর প্রশাসনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত, নীতিনির্ধারণ এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম সরাসরি রাষ্ট্রীয় স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত। ফলে এই প্রতিষ্ঠানের ভেতরে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তা কেবল একটি ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে নয়, বরং জনস্বার্থ ও জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবেই বিবেচিত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরের এস্টেট বিভাগের কর্মকর্তা মুহাম্মদ শিহাব উদ্দিনকে ঘিরে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে এনেছে।
এই অভিযোগগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। দুদক চেয়ারম্যান বরাবর দাখিল করা ওই অভিযোগপত্রে মুহাম্মদ শিহাব উদ্দিনের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্য, অবৈধ ইজারা, ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রভাব খাটিয়ে ফাইল প্রসেসিং এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। অভিযোগটি দাখিল করেন সাইফুল বেগম নামের এক ব্যক্তি।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দরের এস্টেট বিভাগ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিভাগ। এই বিভাগের আওতায় বন্দর এলাকার জমি, জেটি, ইজারা, অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক চুক্তির বিষয়গুলো পরিচালিত হয়। এসব সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িত থাকে বিপুল অঙ্কের অর্থনৈতিক স্বার্থ, করপোরেট বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক সুবিধা। ফলে এই বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সততা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় স্বার্থের জন্য অপরিহার্য। অভিযোগকারীর দাবি, এই সংবেদনশীল বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে মুহাম্মদ শিহাব উদ্দিন তার ক্ষমতা ও প্রভাবকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করেছেন।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী এলাকায় একটি শিল্পগোষ্ঠীর প্রস্তাবিত জেটি নির্মাণের অনুমোদন ঘিরে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, জেটির অনুমোদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ফাইল প্রসেসিংয়ের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় অনুমোদন পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে অন্তত ৫০ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করা হয়। অভিযোগকারী দাবি করেন, এই ঘুষ দাবির বিষয়টি বন্দর প্রশাসনের উচ্চপর্যায়েও আলোচনার জন্ম দেয় এবং এ নিয়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। যদিও সংশ্লিষ্ট শিল্পগোষ্ঠী বা অভিযুক্ত কর্মকর্তার পক্ষ থেকে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি, তবু অভিযোগটির গুরুত্ব বন্দর প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
অভিযোগপত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে আসে ২০২৪ সালে ইনকনট্রেড লিমিটেডকে চট্টগ্রাম বন্দরের মূল্যবান জমি ইজারা দেওয়ার ঘটনা। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় আট একর বন্দরভূমি কোনো ধরনের উন্মুক্ত দরপত্র বা প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া ছাড়াই একটি চুক্তির মাধ্যমে ইনকনট্রেড লিমিটেডকে ইজারা দেওয়া হয়। অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়, ওই জমির বাজারমূল্য আনুমানিক ৪০০ কোটি টাকা। এই ইজারা চুক্তিতে তৎকালীন বন্দর চেয়ারম্যানের পাশাপাশি এস্টেট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে মুহাম্মদ শিহাব উদ্দিনের সংশ্লিষ্টতার কথা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারী বলেন, এই ইজারা প্রদান প্রক্রিয়া সরকারি নীতিমালা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার পরিপন্থী। বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশ এবং বিভিন্ন মহলে আলোচনার জন্ম দিলে পরবর্তীতে তদন্ত শুরু হয়। নতুন বন্দর চেয়ারম্যান দায়িত্ব গ্রহণের পর বিতর্কিত ওই ইজারা বাতিল করা হয় এবং মুহাম্মদ শিহাব উদ্দিনকে এস্টেট বিভাগের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে অন্যত্র সংযুক্ত করা হয়। অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়, এই পদক্ষেপ থেকেই বোঝা যায় যে ইজারা প্রদান প্রক্রিয়াটি প্রশ্নবিদ্ধ ছিল।
দুদকে দাখিল করা অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, মুহাম্মদ শিহাব উদ্দিন বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও কোম্পানির কাছ থেকে জেটি ভাড়া, ফাইল প্রসেসিং ও অনুমোদনের নামে ঘুষ নিয়েছেন বা ঘুষ দাবি করেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, এসএ সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজের জেটি সংক্রান্ত ফাইলে ১০ লাখ টাকা, কনফিডেন্স সল্ট লিমিটেডের জেটি অনুমোদনের ক্ষেত্রে ১০ লাখ টাকা এবং এমইবি ইন্ডাস্ট্রিজ ও ইলিয়াস ব্রাদার্সের ফাইল নবায়নের ক্ষেত্রে প্রায় ৫০ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়, এসব অর্থনৈতিক লেনদেন সরাসরি অভিযুক্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে না হয়ে তার ছোট ভাইয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে বলে অভিযোগকারীর বক্তব্য। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, ওই ব্যক্তি স্থানীয়ভাবে ‘হাফেজ’ নামে পরিচিত। যদিও এসব অভিযোগ এখনো প্রমাণিত নয় এবং তদন্তাধীন, তবু অভিযোগের ধারাবাহিকতা ও বর্ণনার মিল থাকায় বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
অভিযোগকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, শুধু আর্থিক লেনদেনই নয়, মুহাম্মদ শিহাব উদ্দিন রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবহার করে প্রশাসনের ভেতরে চাপ সৃষ্টি করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়, তিনি নিজের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ পদোন্নতির জন্য প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছেন। এমনকি ভিন্নমত পোষণকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর হুমকি বা চাপ প্রয়োগের অভিযোগও তোলা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ক্ষুণ্ন হয়েছে এবং একটি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, এসব অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে তা কেবল একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত অনিয়ম হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দাখিলের বিষয়টি নিশ্চিত করে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, অভিযোগটি গ্রহণ করা হয়েছে এবং প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে এ বিষয়ে দুদকের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্তের সময়সূচি বা অগ্রগতির বিস্তারিত জানানো হয়নি।
এদিকে অভিযুক্ত কর্মকর্তা মুহাম্মদ শিহাব উদ্দিন বা তার পরিবারের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, অভিযোগগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব বা ব্যক্তিগত স্বার্থ থেকে উত্থাপিত। তাদের মতে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী বলা উচিত নয়।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগ দাখিল এবং অভিযোগ প্রমাণ—এই দুইয়ের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। তারা বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তের মাধ্যমে তথ্য-প্রমাণ যাচাইয়ের পরই প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত ব্যক্তি আইনত নির্দোষ হিসেবেই বিবেচিত হবেন।
চট্টগ্রাম বন্দর একটি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এখানে সংঘটিত যেকোনো দুর্নীতি বা অনিয়ম দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বন্দর প্রশাসনের ভেতরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে বিনিয়োগ পরিবেশ, বাণিজ্যিক আস্থা এবং রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে, অভিযোগ যদি তদন্তে মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত প্রমাণিত হয়, সেক্ষেত্রেও তা প্রশাসনের ভেতরে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে। ফলে এই ঘটনায় স্বচ্ছ, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তই একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
সব মিলিয়ে, চট্টগ্রাম বন্দরের এস্টেট বিভাগের কর্মকর্তা মুহাম্মদ শিহাব উদ্দিনকে ঘিরে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ বন্দর প্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ যেমন জরুরি, তেমনি অভিযোগ খণ্ডিত হলে নিরপরাধ ব্যক্তির সুনাম ও পেশাগত মর্যাদা রক্ষাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এখন সব নজর দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তের দিকে—এই অভিযোগগুলোর সত্যতা কতটা, তা নির্ধারণ করবে তদন্তের ফলাফল ও সময়।
প্রিন্ট
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















