ঢাকা ০৪:০৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৫
সংবাদ শিরোনাম ::
ঘুসের টাকা নিতে বিকাশ নাম্বার দিয়ে যান পিডিবির প্রকৌশলী ব্যাংককে ড. ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক গঠনমূলক সম্পর্ক নষ্ট করে এমন বক্তব্য এড়িয়ে চলার আহ্বান মোদির বিমসটেক সদস্য দেশগুলোকে একযোগে কাজ করার আহ্বান প্রধান উপদেষ্টার মৃত সন্তান প্রসবে বাংলাদেশ এখনো দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন আয়োজন করা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার নবীনগরে দুই গ্রামবাসীর মধ্যে সংঘর্ষ, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যৌথ বাহিনী মোতায়েন জেলা ও ইউনিয়ন নগরজুড়ে ছোট নেতার বড় পোস্টার ডা. বোরহানে অবৈধ সিন্ডিকেটে দুর্ভোগের শিকার রোগীরা বনশ্রীতে নারী সাংবাদিককে হেনস্তা-মারধর, গ্রেপ্তার ৩ থাইল্যান্ডে পৌঁছেছেন প্রধান উপদেষ্টা

ঘুসের টাকা নিতে বিকাশ নাম্বার দিয়ে যান পিডিবির প্রকৌশলী

অনুসন্ধান রিপোর্ট
  • আপডেট টাইম : ১০:০৭:১০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৪ এপ্রিল ২০২৫
  • / ১ ৫০০০.০ বার পাঠক

টাঙ্গাইলের ঘাটাইলের নলমা পূর্বপাড়ার বাসিন্দা লুৎফর রহমান। পরিবার নিয়ে পৈতৃক ভিটাতেই থাকেন তিনি। এই পরিবারের রয়েছে ব্যাটারি চালিত একটি অটোরিকশা। সেটি চার্জ দেন নিজের বাড়ির বিদ্যুৎ লাইন থেকে। বিষয়টি জেনে সেখানে যান ঘাটাইল বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) উপ-সহকারী প্রকৌশলী শাহাদত হোসেন। পরিবারটির সদস্যদের হুমকি দেন পিডিবির এ কর্মকর্তা। পরে তাদের থেকে নগদ পাঁচ হাজার টাকা নেন শাহাদত। দিয়ে আসেন নিজের বিকাশ নাম্বার। পরিবারটিকে বলে, আরও দেড় হাজার টাকা বিকাশ করতে।

লুৎফর রহমানের স্ত্রী বলেন, ‘হায়-হায়গো আমার কাছ থেকে কীভাবে টাকা নিল!’ কত টাকা নিয়েছেন তার উত্তরে বলেন, ‘পাঁচ হাজার টাকা নিছে। আরও দেড় হাজার টাকা পাঠাইতে বলেছে। বিকাশ নাম্বার দিয়ে গেছে। টাকার জন্য ওই নাম্বার থেকে একদিন ফোনও দিয়েছিল। আমরা গরিব মানুষ বৈধভাবে মিটার এনে বিদ্যুৎ লাইন নিয়েছি। আমাগো একটি ব্যাটারিচালিত অটো আছে। ওইটা চার্জ দেই বলে আমাগো বাড়ি আইসা ধোঁকা দিয়া টাকাগুলো নিয়া গেল।’

ওই নারীর যখন কথাগুলো বলছিল তখন সেখানে আসেন পাশের বাড়ির ষাটোর্ধ্ব এক বৃদ্ধা। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘আমাগো কাছ থেকেও চার হাজার টাকা নিছে। এক হাজার টাকার ৪টি নোট দিছি।’

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার হুমকি ও মামলার ভয় দেখিয়ে টাকা নিচ্ছেন শাহাদত হোসেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মাত্র দেড় মাস আগে পিডিবির ক্রয় ও বিতরণ বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী শাহাদত হোসেন ঘাটাইলে যোগদান করেন। যোগদানের পরেই বহিরাগতদের দিয়ে সিন্ডিকেট করে তিনি জড়িয়ে পড়েছেন ঘুস-বাণিজ্যে। বিভিন্ন এলাকায় যুগান্তর অনুসন্ধান করলে অভিযোগের সত্যতাও মিলে।

নলমা পূর্বপাড়ার ষাটোর্ধ্ব ওই বৃদ্ধার ছেলে হাসেন আলী বলেন, ‘টাকা না নিয়ে কোনোভাবেই সে গেল না।’ হাসেন আলী তার বাড়ির সামনে বিদ্যুতের একটি ট্রান্সফরমার আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলেন, ‘লাইন টানানোর সময় এক লাখ ৫৫ হাজার টাকা দিয়ে ওই ট্রান্সফরমারটি এনেছি।’

উপজেলার পাড়া কুশারিয়া গ্রামের এক নারী বলেন, ‘আমাদের কাছ থেকেও সাড়ে চার হাজার টাকা নিয়েছে।’ কী কারণে টাকা দিলেন এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘তা না হলে মামলা দেবে বলে ভয় দেখায়।’

ওই গ্রামের বাসিন্দা আলমগীরের কাছ থেকেও টাকা নিয়েছেন শাহাদত। আলমগীর বলেন, ‘আমরা বৈধভাবে মিটারের মাধ্যমে বিল দেই। তারপরও ধোঁকা দিয়ে আমাদের দুই ঘর থেকে সাড়ে চার হাজার টাকা নেয়। আমাদের গ্রামের সহিদ খানের কাছ থেকে দুই হাজার ও সোহেল মিয়ার কাছ থেকে ৫০০ টাকা নিয়েছে।’

সত্তুর বাড়ি গ্রামের মধু খাঁর ছেলে ইয়াছিন বলে, ‘আমার ছোট একটি খামার আছে। সেখানে প্রতি মাসে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ করি সেই ইউনিটের বিল নেওয়ার কথা। কিন্তু অফিস থেকে বিল করে ৩০০ ইউনিটের। মিটার থাকার পরও আমি বেশি বিল দিচ্ছি। গত দুই বছর ধরে এভাবে বিল দিয়ে যাচ্ছি। হঠাৎ সেদিন বিদ্যুৎ অফিসের নতুন এক ইঞ্জিনিয়ার আইসা লাইন কাটার হুমকি দেয়। আমার কাছে সাড়ে সাত হাজার টাকা চাই। পরে আমি তাকে দেড় হাজার টাকা দেই।’

বগুড়া থেকে এসে ঘাটাইলের বেলুয়াটিকি নামক স্থানে একটি পোলট্রি খামার করেছেন রাশেদ নামের এক ব্যক্তি। সরজমিনে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে ওই খামারে কাজ করা সুজনের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। সুজন বলেন, ‘টাকা ছাড়াই কি গেছে। তবে কত টাকা নিছে এটা আমার জানা নেই।’

খামারের মালিক রাশেদ মিয়া বলতে পারবেন বলে জানান সুজন। পরে বুধবার রাশেদ মিয়ার মোবাইলে ফোন করলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। বেলুয়াটেকী গ্রামের এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়েছেন।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে শাহাদত হোসেনের মোবাইলে ফোন দেওয়া হলে তিনি কোনো মন্তব্য না করে লাইন কেটে দেন। পরে বারবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। অবশেষে বৃহস্পতিবার বেলা পৌনে ২টায় বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে সামনাসামনি প্রশ্ন করার সঙ্গে সঙ্গে ‘আমার সময় নেই’ এ কথা বলে চেয়ার থেকে উঠে দ্রুত কেটে পড়েন তিনি।

আরো খবর.......

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

ঘুসের টাকা নিতে বিকাশ নাম্বার দিয়ে যান পিডিবির প্রকৌশলী

আপডেট টাইম : ১০:০৭:১০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৪ এপ্রিল ২০২৫

টাঙ্গাইলের ঘাটাইলের নলমা পূর্বপাড়ার বাসিন্দা লুৎফর রহমান। পরিবার নিয়ে পৈতৃক ভিটাতেই থাকেন তিনি। এই পরিবারের রয়েছে ব্যাটারি চালিত একটি অটোরিকশা। সেটি চার্জ দেন নিজের বাড়ির বিদ্যুৎ লাইন থেকে। বিষয়টি জেনে সেখানে যান ঘাটাইল বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) উপ-সহকারী প্রকৌশলী শাহাদত হোসেন। পরিবারটির সদস্যদের হুমকি দেন পিডিবির এ কর্মকর্তা। পরে তাদের থেকে নগদ পাঁচ হাজার টাকা নেন শাহাদত। দিয়ে আসেন নিজের বিকাশ নাম্বার। পরিবারটিকে বলে, আরও দেড় হাজার টাকা বিকাশ করতে।

লুৎফর রহমানের স্ত্রী বলেন, ‘হায়-হায়গো আমার কাছ থেকে কীভাবে টাকা নিল!’ কত টাকা নিয়েছেন তার উত্তরে বলেন, ‘পাঁচ হাজার টাকা নিছে। আরও দেড় হাজার টাকা পাঠাইতে বলেছে। বিকাশ নাম্বার দিয়ে গেছে। টাকার জন্য ওই নাম্বার থেকে একদিন ফোনও দিয়েছিল। আমরা গরিব মানুষ বৈধভাবে মিটার এনে বিদ্যুৎ লাইন নিয়েছি। আমাগো একটি ব্যাটারিচালিত অটো আছে। ওইটা চার্জ দেই বলে আমাগো বাড়ি আইসা ধোঁকা দিয়া টাকাগুলো নিয়া গেল।’

ওই নারীর যখন কথাগুলো বলছিল তখন সেখানে আসেন পাশের বাড়ির ষাটোর্ধ্ব এক বৃদ্ধা। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘আমাগো কাছ থেকেও চার হাজার টাকা নিছে। এক হাজার টাকার ৪টি নোট দিছি।’

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার হুমকি ও মামলার ভয় দেখিয়ে টাকা নিচ্ছেন শাহাদত হোসেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মাত্র দেড় মাস আগে পিডিবির ক্রয় ও বিতরণ বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী শাহাদত হোসেন ঘাটাইলে যোগদান করেন। যোগদানের পরেই বহিরাগতদের দিয়ে সিন্ডিকেট করে তিনি জড়িয়ে পড়েছেন ঘুস-বাণিজ্যে। বিভিন্ন এলাকায় যুগান্তর অনুসন্ধান করলে অভিযোগের সত্যতাও মিলে।

নলমা পূর্বপাড়ার ষাটোর্ধ্ব ওই বৃদ্ধার ছেলে হাসেন আলী বলেন, ‘টাকা না নিয়ে কোনোভাবেই সে গেল না।’ হাসেন আলী তার বাড়ির সামনে বিদ্যুতের একটি ট্রান্সফরমার আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলেন, ‘লাইন টানানোর সময় এক লাখ ৫৫ হাজার টাকা দিয়ে ওই ট্রান্সফরমারটি এনেছি।’

উপজেলার পাড়া কুশারিয়া গ্রামের এক নারী বলেন, ‘আমাদের কাছ থেকেও সাড়ে চার হাজার টাকা নিয়েছে।’ কী কারণে টাকা দিলেন এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘তা না হলে মামলা দেবে বলে ভয় দেখায়।’

ওই গ্রামের বাসিন্দা আলমগীরের কাছ থেকেও টাকা নিয়েছেন শাহাদত। আলমগীর বলেন, ‘আমরা বৈধভাবে মিটারের মাধ্যমে বিল দেই। তারপরও ধোঁকা দিয়ে আমাদের দুই ঘর থেকে সাড়ে চার হাজার টাকা নেয়। আমাদের গ্রামের সহিদ খানের কাছ থেকে দুই হাজার ও সোহেল মিয়ার কাছ থেকে ৫০০ টাকা নিয়েছে।’

সত্তুর বাড়ি গ্রামের মধু খাঁর ছেলে ইয়াছিন বলে, ‘আমার ছোট একটি খামার আছে। সেখানে প্রতি মাসে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ করি সেই ইউনিটের বিল নেওয়ার কথা। কিন্তু অফিস থেকে বিল করে ৩০০ ইউনিটের। মিটার থাকার পরও আমি বেশি বিল দিচ্ছি। গত দুই বছর ধরে এভাবে বিল দিয়ে যাচ্ছি। হঠাৎ সেদিন বিদ্যুৎ অফিসের নতুন এক ইঞ্জিনিয়ার আইসা লাইন কাটার হুমকি দেয়। আমার কাছে সাড়ে সাত হাজার টাকা চাই। পরে আমি তাকে দেড় হাজার টাকা দেই।’

বগুড়া থেকে এসে ঘাটাইলের বেলুয়াটিকি নামক স্থানে একটি পোলট্রি খামার করেছেন রাশেদ নামের এক ব্যক্তি। সরজমিনে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে ওই খামারে কাজ করা সুজনের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। সুজন বলেন, ‘টাকা ছাড়াই কি গেছে। তবে কত টাকা নিছে এটা আমার জানা নেই।’

খামারের মালিক রাশেদ মিয়া বলতে পারবেন বলে জানান সুজন। পরে বুধবার রাশেদ মিয়ার মোবাইলে ফোন করলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। বেলুয়াটেকী গ্রামের এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়েছেন।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে শাহাদত হোসেনের মোবাইলে ফোন দেওয়া হলে তিনি কোনো মন্তব্য না করে লাইন কেটে দেন। পরে বারবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। অবশেষে বৃহস্পতিবার বেলা পৌনে ২টায় বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে সামনাসামনি প্রশ্ন করার সঙ্গে সঙ্গে ‘আমার সময় নেই’ এ কথা বলে চেয়ার থেকে উঠে দ্রুত কেটে পড়েন তিনি।