ঢাকা ০৭:০৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৪
সংবাদ শিরোনাম ::
রাণীশংকৈলে যথাযোগ্য মর্যাদায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন নওগাঁর নিয়ামতপুরে শহীদ দিবস ও আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২১শে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে ভাষা শহীদদের স্বরনে শ্রদ্ধাঞ্জলি দেবহাটা উপজেলা সমিতির ও পিকনিক স্পট পরিদর্শন কালিহাতীতে মহান শহিদ ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত আজ সারা ভারতের বিভিন্ন যায়গার সাথে সিরাকল মহাবিদ্যালয়ে উদযাপিত হল ভাষা দিবস আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উৎযাপন ভৈরবে অমর ২১শে ফেব্রুয়ারি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে সকল বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়েছে কিশোরগঞ্জে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত কমলনগরে সয়াবিন ক্ষেত থেকে যুবকের লাশ উদ্ধার ২১ শে ফেব্রুয়ারী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে

বহু বিতর্কে ভরা ২০১১-র বাংলাদেশ

সময়ের কন্ঠ রিপোর্ট।।

বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে মিষ্টি খাওয়ানোর রেওয়াজ আছে। কিন্তু ইংরেজি নববর্ষের প্রথম লগ্নে নাচ গান ও ডৃংকসের রেওয়াজ থাকলেও বছরের প্রথম দিনে মিষ্টি খাওয়ানোর রেওয়াজ নেই। তবুও তার ব্যতিক্রম করে দুটি মিষ্টি সংবাদ আপনাদের মনে করানো যেতে পারে।

এক. ১৮ ডিসেম্বরে ইনজিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশনে মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা সভায় বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া তার ভাষণের শুরুতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রয়াত জাতীয় নেতাদের প্রতি। সেই সময়ে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের নামের আগে বঙ্গবন্ধু শব্দটি ব্যবহার করেন।

এটি ছিল তার পক্ষ থেকে অন্যতম জাতীয় নেতার প্রতি ভদ্রতা ও সৌজন্যতার চমৎকার প্রকাশ।

দুই. এর ক’দিন পরে ২৬ ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা এবং অধুনালুপ্ত বাকশালের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাকের মরদেহ যখন সমাহিত করা হয় তখন তাকে শেষ বিদায় জানানোর জন্য পুষ্পার্ঘ নিয়ে বনানী করবস্থানে যান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত (উফ! এই ‘ভারপ্রাপ্ত’ শব্দটি তার আরো কতো দিন বহন করতে হবে?) সেক্রেটারি জেনারেল মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপির স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য মওদুদ আহমেদসহ প্রধান বিরোধী দলের আরো কিছু নেতা কর্মী। এটি ছিল তাদের পক্ষ থেকে প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের একজন প্রয়াত প্রধান নেতার প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান জানানোর অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
খালেদা জিয়া এই ভদ্রতা-সৌজন্যতা প্রকাশ না করলেও পারতেন। মির্জা আলমগীর ও মওদুদ আহমেদ শ্রদ্ধা ও সম্মান নিবেদন না করলেও পারতেন। তারা নীরব থাকতে পারতেন। অথবা আওয়ামী নেত্রী- নেতাদের স্ট্যান্ডার্ডে নেমে যেতে চাইলে মিথ্যা প্রচারণাও করতে পারতেন। সেটা তারা করেন নি।

মুক্তিযোদ্ধা কে?
এর কদিন আগেই কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঠিক তাই করেছিলেন। পড়–ন দৈনিক মানবজমিন (১৫.১২.১১)-র রিপোর্ট :
মুক্তিযুদ্ধে সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ভূমিকা নিয়ে আবারও প্রশ্ন তুললেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, যুদ্ধের সময় তাকে কয়েক দফায় সাসপেন্ড করা হয়েছিল। তিনি রণক্ষেত্রে যুদ্ধ করেছেন তারও তেমন প্রমাণ মেলেনি। বরং তিনি রিটৃট (পশ্চাৎপদ) মেজর হিসেবে পরিচিত ছিলেন। গায়ে গুলি লাগবে, বোমা পড়বে এই ভয়ে তিনি দূরে দূরে থাকতেন। ঘটনাচক্রে তিনি একটি সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এটি ছিল বাস্তবতা। গতকাল শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলনে কেন্দ্রে আয়োজিত আলোচনা সবায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, জিয়াউর রহমান যুদ্ধের সময় আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে চাকরি করতেন। তাকে পদোন্নতি দিয়ে মেজর থেকে মেজর জেনারেল করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। তখন দেশ চালাতো আওয়ামী লীগ সরকার। আওয়ামী লীগ যুদ্ধ করেনিÑ খালেদা জিয়ার এই বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, যে সরকার যুদ্ধ পরিচালনা করেছে সেই সরকারের অধীনে চাকরি করতেন জিয়া। এ বিষয়টি তাদের জানা উচিত। দেশে কারা মুক্তিযুদ্ধ করেছে ইতিহাসই তার সাক্ষী। বিএনপি নেত্রীর কাছ থেকে আমাদের মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট নিতে হবে না। তিনি বলেন, আমাদের পরিবারের প্রতিটি সদস্য মুক্তিযুদ্ধ করেছে। আমার মায়ের সঙ্গে শেখ কামালকে বন্দি করা হয়েছিল। পরে সে গেরিলা কায়দায় সেখান থেকে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। তার এই পালিয়ে যুদ্ধে অংশ নেয়ার ঘটনা অনেকের জন্য দৃষ্টান্ত ছিল। শেখ ফজলুল হক মণি সারা দেশের বিভিন্ন সেক্টরে ঘুরে ঘুরে কোথায় কে যুদ্ধ করছে কার কাছে কি অস্ত্র ছিল তার তালিকা করতো। এরকম একটি খাতাও পাওয়া গেছে। এটি ডকুমেন্ট হিসেবে রাখা আছে। শুধু মুক্তিযুদ্ধ নয়, প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে আমাদের ভূমিকা আছে।

তিনি বলেন, সেই স্কুল জীবনে স্কুলের দেয়াল টপকে আমার আন্দোলনে যাওয়া শুরু।

শেখ হাসিনা এই ভাষণে তার অন্যান্য আত্মীয়দের কথা বললেও তার পিতার কথা বলেন নি। কেন? তিনিও কি রিটৃট করে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন? করে থাকলে কোথায় করেছিলেন?
এই ভাষণে জানা গেল শেখ হাসিনা স্কুলের দেয়াল টপকে আন্দোলনমুখী জীবন শুরু করেছিলেন। আমরা কি বলবো শেখ হাসিনাও ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা? অপর দিকে মুক্তিযোদ্ধা জিয়াকে যদি সমালোচনা করতে হয় তাহলে সেটা অন্তত শুদ্ধ ভাষায় হওয়া বাঞ্ছনীয়। রিটৃট মেজর নয়Ñ রিটৃটিং মেজর বলা উচিত ছিল। বৃটেনের মার্গারেট থ্যাচারের ইংরেজি উচ্চারণ তেমন ভালো ছিল না। প্রধানমন্ত্রী হবার পর তিনি ইংরেজি ভাষা ও উচ্চারণে নিয়মিত লেসন নিয়ে নিজেকে উন্নত করেছিলেন। শেখ হাসিনা এই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে পারেন।

কুটিল, কুৎসিত ও কুরুচিপূর্ণ
২০১১ জুড়ে জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে এই ধরনের অপপ্রচার চলেছে। অন্যান্য আওয়ামী নেতারা বলেছেন, জিয়া ছিলেন ছদ্মবেশী পাকিস্তানি চর! এই অপপ্রচার ছিল কুটিল, কুৎসিত ও করুচিপূর্ণ। উল্লেখ্য, একটি সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশের অর্থনীতির বুনিয়াদ প্রতিষ্ঠাতা বিএনপি আমলের অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের মৃত্যুর পর শেখ হাসিনা কোনো শোক প্রকাশ করেননি। একই ভাবে বিএনপি নেতা ও সেক্টর কমান্ডার হামিদুল্লাহ খান বীর প্রতীকের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেননি প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি। সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় তার জানাযায় স্পিকার আব্দুল হামিদ ছাড়া কোনো মন্ত্রী, এমপি যাননি।

মার্চ মানে কি?
১৭ অক্টোবর ২০১১-তে শ্রীপুরে মাওনা বহুমুখী হাই স্কুল মাঠে আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক জনসভায় শেখ হাসিনা বলেন, রোড মার্চ মানে পায়ে হেটে কর্মসূচি পালন। কিন্তু বিরোধী দলীয় নেত্রী গাড়িতে চড়ে কার র‌্যালি করলেন। তিনি গাড়িতে চড়িয়া হাটিয়া চলিলেন। এ যেন ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ হাটিয়া চলিল। রোড শোতে তারা দুই হাজার দামি গাড়ি প্রদর্শন করলেন। এতো গাড়ির টাকা কোথায় পেলো। অতীতে তারা লুটপাট ছাড়া আর কিছুই করেনি। এখন গাড়ি নিয়ে রোড মার্চের নামে পিকনিক করে বেড়াচ্ছেন। প্রতিটি গাড়ির নম্বর-প্লেট নিয়ে খুজে বের করতে হবে, কোথা থেকে এ সব গাড়ি এসেছে। গাড়ি কেনার টাকার উৎস কোথায়, তার হিসাব নেয়া হবে।

শেখ হাসিনার এই মন্তব্যেও তার ইংরেজি ভাষায় দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। ইংরেজি মার্চ শব্দটির অর্থ শুধু রাস্তায় হেটে যাওয়াই নয়। তিনি যদি বিবিসি ইংলিশ ডিকশনারি (পৃষ্ঠা ৬৮৩) খুলে দেখেন তাহলে জানবেন মার্চের একাধিক অর্থ হতে পারে। যেমন, ঞযব সধৎপয ড়ভ ংড়সবঃযরহম রং রঃং ংঃবধফু ফবাবষড়ঢ়সবহঃ ঢ়ৎড়ংৎবংং (কোনো কিছুর মার্চ অর্থ তার নিয়মিত উন্নতি অথবা অগ্রযাত্রা)।
খালেদা জিয়া অক্টোবর ২০১১-তে সিলেট অভিমুখে যে রোড মার্চ শুরু করেন সেটা নিয়মিতভাবে তিনি করে এসেছেন। তিনি গিয়েছেন উত্তর দিকে চাপাইনবাবগঞ্জে এবং দক্ষিণ পশ্চিম দিকে খুলনা-যশোরে। জানুয়ারি ২০১২-র দ্বিতীয় সপ্তাহে যাবেন দক্ষিণ দিকে ফেনী ও চট্টগ্রামে। সুতরাং তার এই নিয়মিত ও অগ্রগামী রাজনৈতিক অভিযানকে বিবিসির ডিকশনারি মোতাবেক রোড মার্চ বলাই যথার্থ।

বুর্জোয়া পলিটিক্সে নাজুক প্রশ্ন করবেন না
প্রধানমন্ত্রী এই রোড মার্চে অংশগ্রহণকারী গাড়ি কেনার টাকার উৎস কোথায় জানতে চেয়েছেন। এর প্রতিক্রিয়ায় যদি কেউ বিদেশে অবস্থানরত প্রধানমন্ত্রীর নিকটাত্মীয়দের গাড়ি এবং বাড়ি কেনার ডলার-পাউন্ডের উৎস কোথায় জানতে চায় তাহলে তিনি কি উত্তর দেবেন?
বস্তুত বুর্জোয়া রাজনীতিতে এসব প্রশ্ন পলিটিশিয়ানদের (আওয়ামী-বিএনপি সবারই) না তোলাই শ্রেয়। এই ধরনের প্রশ্নের উত্তর অনেক ইংরেজি-বাংলা পত্রিকার সম্পাদক, টিভি-রেডিওর কর্মকর্তারাও দিতে পারবেন না।
গাড়ির নাম্বার টোকাটুকির সম্ভাবনার পর মানুষ আরো কিছুটা সতর্ক হয়ে গিয়েছে। অনেকেরই বিশ্বাস বর্তমান সরকার টেলিফোন সংলাপ ট্যাপিং (ঞধঢ়ঢ়রহম)-এ যথেষ্ট কর্মী নিয়োগ করেছে। ২০১১-তে অনেকেই মোবাইল ফোনে রাজনৈতিক আলোচনা বাদ দিয়েছেন।

বিতর্কিত ডেড রেকনিং
মুক্তিযুদ্ধে শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমানের ভূমিকা কি ছিল ২০১১-তে সেই বিতর্কে আরেকটি ইসু যোগ হয়। পড়–ন দৈনিক আমার দেশ (১৭.১২.১১)-র রিপোর্ট :
সঠিকভাবে কেউই জানেন না ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে কত মানুষ তাদের জীবন হারিয়েছিল। কিন্তু নিঃসন্দেহে ওই যুদ্ধে অনেক মানুষ জীবন দিয়েছে। নিরপেক্ষ গবেষকরা মনে করেন, এই সংখ্যা তিন থেকে পাচ লাখের মধ্যে। বাংলাদেশ সরকার মনে করে, ১৯৭১-এ মারা গেছে ৩০ লাখ বাঙালি।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪০ বছর পূর্তিতে বিবিসি নিউজের এক রিপোর্টে এ তথ্য দেয়া হয়েছে।”
মার্ক ডামেট। বাংলাদেশের যুদ্ধ : যে রিপোর্ট ইতিহাস পরিবর্তন করেছে’ শীর্ষক এ রিপোর্টে সাংবাদিক অ্যান্টনি মাসকারেনহাস ১৯৭১ সালের ১৩ জুন বৃটেনের সানডে টাইমস পত্রিকায় যে রিপোর্ট পাঠিয়েছিলেন তার মধ্যে দিয়েই যে পাকিস্তানি নৃশংসতার কাহিনী বিশ্ববাসী পুরোপুরি জানতে পেরেছিল তা-ই তুলে ধরা হয়েছে।
বিবিসি টেলিভিশন বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৭টার খবরে অধ্যাপক শর্মিলা বোসের সাক্ষাৎকার প্রচার করেছে। এই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ বাঙালি মারা গেছে। এর আগে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোসের এ নিকটাত্মীয়ের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রকাশিত গ্রন্থ ‘ডেড রেকনিং’- ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। এই বইয়ে তিনি বলেন, ’৭১-এ পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে যে গণধর্ষণের অভিযোগ তোলা হচ্ছে তা অপপ্রচার। এ তথ্য ঠিক নয়।’
এখানে জানিয়ে রাখা উচিত শর্মিলা বোস-এর এই বই উবধফ জবপশড়হরহম, গবসড়ৎরবং ড়ভ ঃযব ১৯৭১ ইধহমষধফবংয ডধৎ (ডেড রেকনিং অর্থাৎ মৃতের সংখ্যা গণনা) ২০১১- তে ঘটা করে লন্ডন ও নিউইয়র্কে লঞ্চ করা হয়েছে। প্রকাশক।

নতুন কয়েকটি বিতর্ক
২০১১-তে চল্লিশ বছর আগের পুরনো ঘটনাগুলো নিয়ে বিতর্ক শুরু হবার পাশাপাশি নতুন কিছু ঘটনা দিয়ে প্রচ- বিতর্কও শুরু হয়েছে।
২০১১-তে বহুল আলোচিত সংবিধান (পঞ্চদশ সংশোধন) বিল, স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) সংশোধন বিল, উপজেলা পরিষদ (সংশোধন) বিল, অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ (সংশোধন) বিলসহ উল্লেখযোগ্য আলোচিত বিল পাস হয়। এ বছর চারটি অধিবেশনে মোট ২২টি বিল পাস হয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দুই দফা বিভক্তি ভোটের মাধ্যমে সংবিধান (পঞ্চদশ সংশোধন) বিল-২০১১ বিদায়ী বছরের ৩০ জুন পাস হয়। সংবিধানে ৫৫টি দফা যুক্ত করে বিলটি পাসের পক্ষে ২৯১টি এবং বিপক্ষে একটি ভোট পড়ে। সংবিধানের এ সংশোধনী প্রত্যাখ্যান করেছে বিএনপি-জামায়াত জোট। সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার জন্য বিএনপি দাবি জানিয়ে চলেছে।
বিরোধী দলবিহীন প্রায় মৃত সংসদে মাত্র চার মিনিটে ঢাকা সিটি করপোরেশনকে (ডিসিসি)ভাগ করা সংক্রান্ত বিল পাস হয়েছে। উপজেলা পরিষদ (সংশোধন) বিলটি পাস হয়েছে মাত্র পাচ মিনিটে। ২৯ নভেম্বর তড়িঘড়ি করে মাত্র নয় মিনিটে বিল দু’টি পাস হয়। এ দিন সংসদ চলে মাত্র ১০ মিনিট। ডিসিসি বিভক্তিকরণ বিলে বিরোধী দলের ১১ জন, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাসদের মইনুদ্দীন খান বাদল, শাহ জিকরুল আহমেদ ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ফজলুল আজিম বিলের ওপর জনমত যাচাই-বাছাই ও সংশোধনী আনলেও সংসদে তাদের অনুপস্থিতির কারণে তা নাকচ হয়ে যায়। ডিসিসি ভাগ করার প্রতিবাদে বিএনপি-জামায়াত জোট রাজধানীতে হরতাল পালন করে।
নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বিরোধিতার পরও উপেজেলা পরিষদে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কর্তৃত্ব বহাল রেখেই উপজেলা পরিষদ (সংশোধন) বিলটি পাস হয়। দেশের নাগরিক ও স্থায়ী বাসিন্দাদের কাছে অর্পিত সম্পত্তি ফেরত দেওয়ার বিধান রেখে বহুল আলোচিত অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ (সংশোধন) বিল পাস হয়। সাংবাদিকদের গ্রেফতারি পরোয়ানার পরিবর্তে শুধু সমন জারির ব্যবস্থা রেখে ফৌজদারি কার্যবিধি (সংশোদনী) বিল পাস হয়।
২০১১-তে এ বছর সংসদ অধিবেশনের কার্যদিবস ছিল ৮০টি। এর মধ্যে বিএনপি-জামায়াত জোট সংসদে গেছে আট কার্যদিবস। আর বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া গেছেন এক কার্যদিবস। সরকার গঠনের পর নবম জাতীয় সংসদের একাদশ অধিবেশনের মোট ২৫৪ কার্যদিবসের মধ্যে বিরোধী দল সংসদে গেছে মাত্র ৫৪ কার্যদিবস। এর মধ্যে খালেদা জিয়া গেছেন ছয় দিন। ১১টি অধিবেশনের মধ্যে দ্বিতীয়, তৃতীয়, ষষ্ঠ, সপ্তম, নবম, দশম ও একাদশ অধিবেশনে পুরোপুরিই অনুপস্থিত ছিলেন তারা। বিরোধী দল পঞ্চম অধিবেশনে যোগ দেয় মাত্র এক দিনের জন্য। চলতি সংসদের দশম অধিবেশন পর্যন্ত ২৪১ কার্যদিবসের মধ্যে আটজন মন্ত্রীই ১৫০ কার্যদিবসের কম সংসদে উপস্থিত ছিলেন। ১০ জন এমপি রয়েছেন যারা ১০০ কার্যদিবসেরও কম সংসদে উপস্থিত ছিলেন। নবম জাতীয় সংসদ অধিবেশন শুরুর প্রথম দিক থেকেই কোরাম (৬০) সংকটের কারণে প্রায় প্রতিদিনই দেরিতে অধিবেশন শুরু হয়েছে। তবে ২৪ ফেব্রুয়ারি কোরাম সংকটের কারণে প্রথমবারের মতো বৈঠক মুলতবি করা হয়।
বিরোধী দলগুলোর সংসদে অনুপস্থিতি তাদের দলের মধ্যেও সমালোচিত হয়েছে। অনেকেই বলেন, যদি আওয়ামী লীগের নেত্রীসহ অন্যান্য আওয়ামী সংসদ সদস্যরা মার্জিত ও শালীন ভাষা আয়ত্ত করতে পারেন, তাহলে হয়তো বিরোধী দলীয় এমপিরা সংসদে ফিরে যেতে পারেন।

নির্বাচন কমিশন বিতর্ক
এই বছরে কেয়ারটেকার সরকার বিতর্কের পাশে আরো দুটি বিতর্ক হয়েছে নির্বাচন কমিশনকে গিরে। এক. নির্বাচন কমিশনের নতুন সদস্য করা হবেন এবং দুই. ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) আগামী নির্বাচনে ব্যবহার করা উচিত হবে কিনা? বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার নির্বাচন থেকে শেষ মুহূর্তে প্রার্থী তৈমুর আলম খন্দকার-কে সরে যেতে অনুরোধ করে। তৈমুর নির্বাচনী ক্যামপেইনে প্রচুর খরচ করা সত্ত্বেও কেন্দ্রের অনুরোধে নির্বাচন থেকে সরে দাড়ান। দলীয় শৃঙ্খলা ও আনুগত্যের অনুকরণযোগ্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন তিনি।
এই নির্বাচনে বিজয়ী হন ড. সেলিনা হায়াৎ আইভী। বিপুল ভোটে পরাজিত হন শেখ হাসিনার মনোনীত প্রার্থী শামীম ওসমান। এই দুর্ঘটনার ড্যামেজ লিমিটেশনের জন্য নির্বাচনের পরে শেখ হাসিনা তলব করেছিলেন প্রথমে শামীম ওসমানকে এবং তাকে পাশের ঘরে রেখে পরে আইভীকে। শেখ হাসিনা এরপর দুজনকে পাশে রেখে ফটো তোলেন এবং আশা প্রকাশ করেন এই ছবি দলীয় সংহতি রক্ষায় সহায়ক হবে। তাই কি? শেখ হাসিনা যদি ফরগিভ করে ফরগেট না করেনÑ তাহলে আইভীও কি সেটা করতে পারেন না? কিন্তু আইভী প্রশংসনীয় ভদ্রতা শিখিয়েছেন যদিও তার দল তার (আইভীর) একনিষ্ঠ আনুগত্যের অধিকার হারিয়েছে।

ফরগিভ-ফরগেট বৃত্তান্ত
ফরগিভ-ফরগেটের ইসুতে ২০১১-তে কয়েকবারই লক্ষ্য করা গেছে শেখ হাসিনা ফরগেটও করেছেন- বিশেষত তিনি নিজে যখন অভিযুক্ত হয়েছেন। পড়–ন আমার দেশ (০৫.০৬.১১)-এ জাকির হোসেনের একটি রিপোর্ট :
তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়ে প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে ফর্মুলা দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন আমরা রিজিড (অনড়) অবস্থানে নই। সংসদে এসে কথা বলুন। কোনো ফর্মুলা থাকলে বলুন। একই সঙ্গে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সমালোচনা করে বলেছেন, এই সরকারের ভাবমর্যাদা সামরিক সরকারকেও হার মানায়। এর কারণেই দেশে এক-এগারোর মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন চলাকালে ১৯৯৫ সালের ১৬ নভেম্বর গাইবান্ধায় আয়োজিত এক সমাবেশে বলেছিলেন, জনগণের ভাত ও ভোটের অধিকার নিশ্চিত করতে তার দল আন্দোলনে নেমেছে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে জনগণ আজ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ। অন্য কোনো ফর্মুলা গ্রহণযোগ্য হবে না।

একই সঙ্গে তিনি বর্তমান মহাজোটের অন্যতম শরিক এবং ওই সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের অন্যতম সহযোগী জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সম্পর্কে বলেছিলেন, দুর্নীতি ও ভোট ডাকাতির কারণে এরশাদ সরকারকে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে দেয়া হয়েছে। অন্য দিকে এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার কারণেই দেশে এক-এগারোর মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল এবং রাজনৈতিক সরকার থাকলে ১/১১ আসতো না, এমন কথা বললেও ওয়ান-ইলেভেনের সরকারের আমলে ২০০৭ সালের ১৫ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র যাওয়ার প্রাক্কালে বিমানবন্দরে তিনি বলেছিলেন, আমাদের আন্দোলনের ফসল এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তারা ফেল করলে আমাদেরও লজ্জা পেতে হবে। বিএনপি-জামায়াত আমাদের দোষারোপ করবে। আশা করব, এ ধরনের পরিস্থিতি যেন না হয়। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে তিনি ওয়ান-ইলেভেনের সরকারের সকল কার্যক্রমের বৈধতা দেয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারতো মহাচোরদেরই ধরছেন। এতে আমাদের ভীত ও আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। দুশ্চিন্তার কি আছে, আমরা ক্ষমতায় গেলে তাদের এসব কার্যক্রম র‌্যাটিফাই করে দেব। দেশের মানুষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কার্যক্রমের প্রশংসা করছে। এই সুন্দর পরিবেশ বজায় থাকতেই নির্বাচন সম্পন্ন করা উচিত।
এসব খবর ওই সময়ের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়। দৈনিক আমার দেশ ও দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত দুটি প্রতিবেদনের অংশবিশেষ তুলে ধরা হলোÑ
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া অন্য কোনো ফর্মুলা মানব না : হাসিনা
সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে জনগণ আজ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ। অন্য কোনো ফর্মুলা গ্রহণযোগ্য হবে না। (দৈনিক বাংলা : ১৭ নভেম্বর ’৯৫)

যুক্তরাষ্ট্র যাওয়ার প্রাক্কালে বিমানবন্দরে শেখ হাসিনা
ক্ষমতায় গেলে বর্তমান সরকারের সব কাজের বৈধতা দেব

বর্তমান সরকারের কার্যক্রমের বৈধতা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা গতকাল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগের আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার তো মহাচোরদেই ধরছেন। এতে আমাদের ভীত বা আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। দুশ্চিন্তার কি আছে? আমরা ক্ষমতায় গেলে তাদের এসব কার্যক্রম ‘র‌্যাটিফাই’ করে দেব। শেখ হাসিনা দ্রুত নির্বাচনের আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, অনির্দিষ্টকালের জন্য নির্বাচন বন্ধ রাখা ঠিক হবে না। তিনি বলেন, দেশের মানুষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কার্যক্রমের প্রশংসা করছে। এই সুন্দর পরিবেশ বজায় থাকতেই নির্বাচন সম্পন্ন করা উচিত। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কর্মকা- প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে। মানুষের প্রশংসা পেয়েছে। এই পরিস্থিতি থাকতে থাকতে নির্বাচন দিলে দেশের জনগণ ও সরকার উভয়ের জন্য মঙ্গল হবে। ভালো কাজ বেশি দিন ধরে রাখা যায় না। তিনি বলেন, ‘সভা থাকতেই কীর্তন শেষ করতে হবে’। …. তিনি আরো বলেন, আমাদের আন্দোলনের ফসল এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তারা ফেল করলে আমাদেরও লজ্জা পেতে হবে। বিএনপি-জামায়াত আমাদের দোষারোপ করবে। আশা করব, এ ধরনের পরিস্থিতি যেন না হয়। (দৈনিক আমার দেশ : ১৬ মার্চ ২০০৭)

ফরগেট প্রসঙ্গে হয়তো কেউ হাসিনাকে মনে করিয়ে দিতে পারেন অতীতে তিনি ৫৭ বছর বয়সে রিটায়ার করার কথা বলেছিলেন। সেটা তিনি এখন ভুলে গিয়েছেন। দশ টাকা কেজিতে চাল খাওয়ানোর কথাও ভুলে গিয়েছেন।

শেখ হাসিনা যে তার কথার বরখেলাপ করে সম্পূর্ণ উল্টো পথে হাটতে পারেন তার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় ২০১১-তে। পড়–ন আমার দেশ (২১.১২.১১) পত্রিকার আরেকটি রিপোর্ট :

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক ও সেনাসদস্যদের মধ্যে ২০০৭ সালে সংঘর্ষের ঘটনায় সম্পৃক্ততার দায়ে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ ও তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদকে বিচারের মুখোমুখি দাড় করানোর সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি।
কমিটি জরুরি সরকারের এই শীর্ষ দুই কুশীলব ছাড়াও ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকায় ডিজিএফআইয়ের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী দুই সেনাকর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব:) এটিএম আমিন ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) চৌধুরী ফজলুল বারী, কর্নেল শামসুল আলম খানের (কর্নেল। শামস) বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইনে শাস্তির সুপারিশ করেছে। কমিটি এর বাইরে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতায় পুলিশের তৎকালীন আইজি নূর মোহম্মদের বিরুদ্ধেও বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংঘর্ষের ঘটনায় গঠিত শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় উপ-কমিটির এসব সুপারিশসংবলিত প্রতিবেদন সংসদীয় মূল কমিটিতে উপস্থাপন করা হলে তা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি রাশেদ খান মেননের সভাপতিত্বে গতকাল সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটির ২৪তম বৈঠকে প্রতিবেদনের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এর আগে গত ৮ ডিসেম্বর উপ-কমিটির বৈঠকে প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা হয়। সকালে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কমিটির সদস্য শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, হুইপ মির্জা আজম, কাজী ফারুক কাদের ও মো. শাহ আলম অংশ নেন।
বৈঠক শেষে রাশেদ খান মেনন সংসদ ভবনের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ বৃফিংয়ে সিদ্ধান্তগুলো তুলে ধরেন। কমিটির পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ তুলে ধরে তিনি বলেন, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমদ ও সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ এ ঘটনার জন্য দায়ী; কারণ ওই সময় সরকারের এই শীর্ষ দুই কর্ণধার ইচ্ছাকৃত নির্লিপ্ত থেকে নিশ্চেষ্ট ভূমিকা পালন করেন। তারা ঘটনা নিরসনে কোনো চেষ্টাই করেননি। কমিটির কাছে আসা তথ্য-উপাত্তের মাধ্যমে এটাই প্রমাণিত হয়। ফখরুদ্দীন ও মইন এ ঘটনার যাবতীয় নির্দেশনা দিয়েছেনÑ যার জন্য তারা কোনোভাবেই এ ঘটনার দায় এড়াতে পারেন না।

একই যাত্রায় কেন পৃথক ফল?
কিন্তু ধারণা হয়েছে মইন-ফখরুদ্দীনের সহযাত্রী ১/১১-এর আরেক চক্রান্তকারী লে. জে. মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে আবারও পুরস্কৃত করছে আওয়ামী লীগ সরকার। নতুন করে তার চাকরির মেয়াদ আরো ছয় মাস বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। এর আগে তার চাকরির বয়স শেষ হওয়ার পর তিন মাস করে দুই দফায় মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। বিতর্কিত এই সেনাকর্মকর্তা বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে কর্মরত আছেন।

একই যাত্রায় কেন পৃথক ফল হচ্ছে? জেমস বন্ড হয়তো এই রহস্যের সমাধান করতে পারতেন। তবে কেউ কেউ বলেন, মতিউর রহমান-মাহফুজ আনাম প্রণীত এবং মইন-ফখরু কর্তৃক বাস্তবায়িত মাইনাস-টু ফর্মুলার এক পর্যায়ে যখন হাসিনা ও খালেদা সাবজেলে ছিলেন তখন তাদের দুজনকেই পৃথিবী থেকে মাইনাস করে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। শোনা যায়, সেই সময়ে এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন মাসুদ। কারণ এক দিকে তিনি রক্ষীবাহিনীর সাবেক সদস্য রূপে শেখ মুজিবের প্রতি কৃতজ্ঞ ছিলেন এবং অন্য দিকে খালেদা জিয়ার ভাই এসকান্দারের ভায়রা-ভাই সুবাদে খালেদার সঙ্গে আত্মীয়তার বন্ধন ছিল।
তবে এই থিওরির সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। শুধু দেখা যাচ্ছে মাসুদ নির্বিবাদে ছিলেন ২০১১-তে।

সমালোচিত র‌্যাব
মইন-ফখরুর রেখে যাওয়া প্রতিষ্ঠান ও তাদের অঙ্গপ্রতিষ্ঠানসমূহ এ বছরে অভিযুক্ত হয়েছে হত্যা ও গুপ্তহত্যার দায়ে। মাসুদ ফিরে এলে কি এসব প্রতিষ্ঠান হিংসা-প্রতিহিংসা মুক্ত হবে?
২০১১-তে উইকিলিকসে ফাস হওয়া তথ্যে জানা যায় (যুগান্তর ১৪.০৯.১১) :
র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে (র‌্যাব) নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে ঢাকার মার্কিন দূতাবাস থেকে একটি তারবার্তা পাঠানো হয় ২০০৫ সালে। তারবার্তায় বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে অনেকের প্রশংসা কুড়ালেও র‌্যাব বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের বিষয়টি নিয়ে সমালোচিত। সম্প্রতি উইকিলিকস এ গোপন তারবার্তাটি প্রকাশ করেছে।
কয়েকটি গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে দূতাবাস ওয়াশিংটনকে জানায়, বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- ছাড়াও র‌্যাব ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। দেশের কয়েকটি স্থানে চাদা নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে র‌্যাবের বিপক্ষে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অপরাধের সঙ্গে র‌্যাব সদস্যরা জড়িয়ে পড়লে তাদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নেবে।
তারবার্তায় বলা হয়েছে, ক্রসফায়ার র‌্যাবের আরেকটি সমালোচিত বিষয়। এর প্রায় সব ঘটনার বিবরণ একই রকম। তারবার্তায় জানানো হয়েছে, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর বলেছিলেন, যখন র‌্যাবের হাতে সন্ত্রাসীরা ক্রসফায়ারে মারা যায়, তখন মানবাধিকার কর্মীরা সোচ্চার হয়ে ওঠেন। কিন্তু সন্ত্রাসীদের হাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের জীবন গেলে তারা কোন কথা বলেন না।

গুপ্তহত্যার জন্য দায়ী সরকার
বিরোধী দলগুলোর মতে র‌্যাবের সেই ট্র্যাডিশন বজায় রেখেছে বর্তমান আওয়ামী সরকার। পড়–ন প্রথম আলো (১৫.১২.২০১১)-র একটি রিপোর্ট :
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ করে বলেছেন, ‘গুপ্তহত্যা রাষ্ট্রসমর্থিত। বিরোধী দলকে দমন-পীড়নের জন্য বর্তমান সরকার গুপ্তহত্যাকে রাজনীতির একমাত্র অনুষঙ্গ করেছে।’
এ হত্যাকা-ের সঙ্গে যে সরকার জড়িত তাতে কোনো সন্দেহ নেই। উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, এখন এসব হত্যাকা-ে জড়িত থাকার জন্য সবার ইঙ্গিত সরকারের দিকে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, তিনি পত্রপত্রিকার মাধ্যমে এসব গুপ্তহত্যা সম্পর্কে জানতে পেরেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপির এই নেতা বলেন, সরকার যে এর সঙ্গে জড়িত নয়, তা সরকারেই অবিলম্বে প্রমাণ করতে হবে।
একই সঙ্গে যশোর জেলা বিএনপির অর্থবিষয়ক সম্পাদক নাজমুল ইসলামকে হত্যার ঘটনায় ১৭ ডিসেম্বর যশোরে হরতাল ডাকা হয়েছে। আজ সংবাদ সম্মেলনে এ হরতালে কেন্দ্রীয়ভাবে সমর্থন দিয়েছে দলটি।

অরাজকতার দিকে দেশ
খুন, গুম, গুপ্তহত্যা প্রভৃতি বাংলাদেশকে এক ভয়াবহ অরাজকতার দিকে টেনে নিয়ে গেছে ২০১১। দেশ ও বিদেশে মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ নিয়ে সোচ্চার হয়েছে। পড়–ন আমার দেশ (২৬.১২.১১)-তে নাছির উদ্দিন শোয়েবের রিপোর্ট :
শেখ হাসিনার তিন বছরে মানবাধিকার লংঘন :
খুন ১২ হাজার
বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- ৩৫৯
গুম ১০০
গুপ্তহত্যার পর লাশ উদ্ধার ১৬
ফাসির দ-প্রাপ্ত আসামি মুক্তি ২২
সাংবাদিক নিহত ৪; গ্রেফতার ৩
মোট অপরাধ ৫ লাখ ৩৭ হাজার ৬৪২

ক্রসফায়ার, গুপ্তহত্যা, নৃশংস খুন ও গুমসহ সহিংস ঘটনায় মহাজোট সরকারের তিন বছরে আইনশৃঙ্খলা এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি ছিল চরম উদ্বেগজনক। র‌্যাব ও পুলিশের বিতর্কিত কর্মকা-ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপক অভিযোগ ওঠে। এর মধ্যে কয়েকটি ঘটনার ওপর বিচার বিভাগীয় তদন্ত চলছে। নির্যাতিত ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলো আদালত ও প্রশাসনের কাছে গিয়েও ন্যায়বিচার পায়নি।

এমন বহু অভিযোগ রয়েছে। পেশাদার খুনি, দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী, চাদাবাজ ও বহু দাগি অপরাধীকে দলীয় বিবেচনায় আইনের আওতায় আনা হয়নি। বরং মৃত্যুদ-প্রাপ্ত ২২ আসামিকে কারাগার থেকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। চাদাবাজি, টেন্ডারবাজি, জনপ্রতিনিধিদের প্রকাশ্যে হত্যা, বিরোধী মতের ব্যক্তিদের নামে মিথ্যা মামলা, আটকের পর রিমান্ড এবং সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে। ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলার তেমন কোনো উন্নতি হয়নি।

স্থানীয় গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে চলতি বছরের শেষার্ধে নাম বদল করে নতুন কায়দায় শুরু হয় গুম-গুপ্তহত্যা। বিভিন্ন স্থান থেকে শাদা পোশাকধারীদের হাতে আটক প্রায় ১শ’ জনের খোজ মেলেনি। রাজধানী ঢাকাতেই চলতি বছর গুম হয়েছে ৩০ জন। এ পর্যন্ত ১৬ জনের লাশ নদী, হাওর ও জঙ্গল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। বিএনপি নেতা ও ৫৬ নং ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলমের কোনো হদিস নেই দু’বছরেও। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগের আঙুল র‌্যাবের বিরুদ্ধেই।
আওয়ামী লীগ বিরোদী দলে থাকাকালে ক্রসফায়ারের কঠোর বিরোধিতা করলেও ক্ষমতায় এসে এর সমর্থন করে। চলতি বছরের ২৩ মার্চ ঝালকাঠির রাজাপুরে তালিকাবুক্ত এক সন্ত্রাসীকে ধরতে গিয়ে র‌্যাবের গুলিতে নিরীহ কলেজ ছাত্র লিমন হোসেন আহত ও পঙ্গু হয়। এ ঘটনায় র‌্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং গঠিত চারটি তদন্ত রিপোর্টে স্ববিরোধী তথ্য পাওয়া যায়। এখনও ইমনের মামলা নিষ্পত্তি হয়নি। পঙ্গু অবস্থায় তাকে র‌্যাবের মামলায় আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে।
ক্রসফায়ারের ঘটনায় উদ্বেগ সৃষ্টি হওয়া এবং কয়েকটি ঘটনায় আদালতে রিট করার পর র‌্যাব সদর দফতর থেকে বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে ক্রসফায়ারকে ‘এনকাউন্টার’ বলে প্রচার চালানো হয়। কিন্তু নাম ভিন্ন হলেও র‌্যাব সদস্যরা নানা কায়দায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- অব্যাহত রাখলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো এর কঠোরভাবে বিরোধিতা করে। ফলে ক্রসফায়ারের পাশাপাশি ২০০৯ সালের দিকে কৌশল বদলে র‌্যাব ও পুলিশ সন্দেহজনক ব্যক্তিকে আটকের পর হাটুতে গুলি করে আহত করার রীতি চালু করে। এ ঘটনায়ও ব্যাপক অভিযোগ ওঠে। অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে যে, সন্দেহজনক ব্যক্তিকে আটক করে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে চোখ বেধে হাটুতে গুলি করে আহত করে অপরাধী বলে প্রচার করা হয়। পর্যবেক্ষক মহল বলছে, ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার, গুপ্তহত্যা, ও বন্দুক যুদ্ধের নাটক সাজিয়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের মতো বিতর্কিত কর্মকা-ে র‌্যাবের প্রশ্নবিদ্ধ ইমেজ আরো ম্লান হয়ে পড়ছে। র‌্যাবের বহু সদস্যও জড়িয়ে পড়েছে নানা অপরাধে। র‌্যাবের দেয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১০ সালেই নানা অপরাধে জড়িত ৭৫৬ জন র‌্যাব সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় বিভিন্ন পদমর্যাদার কমপক্ষে ৩১৪ সদস্যকে গুরুদ-, ৩১০ জন লঘুদ- ও স্ব স্ব বাহিনীতে ফেরত পাঠানো হয়েছে ১৩২ জনকে।মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী ২০০৯, ২০১০ ও চলতি বছরের (২০১১) নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় তিন বছরে (৩৫ মাসে) ৩৫৯ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ে নিহত হন। এর মধ্যে রয়েছেন ২০০৯ সালে ১৫৪ জন, ২০১০ সালে ১২৭ জন ও ২০১১ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে ৭৮ জন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০৪ সালে র‌্যাবের যাত্রা শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত র‌্যাবের বিরুদ্ধে ৭০০ লোককে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। অতীতে এসব হত্যার ব্যাপারে র‌্যাব অথবা সরকার গঠিত বিচার বিভাগীয় কমিটি তদন্ত করেছে। তবে সেসব তদন্তের তথ্য এখনও প্রকাশ করা হয়নি বা গোপনই থেকে গেছে। তবে র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার এম সোহায়েল বলেছেন, র‌্যাব কাউকে আটক করে নিয়ে নিখোজ বা গুম করেছে কেউ এ ধরনের অভিযোগ প্রমাণ করতে পারবে না।
একই সময় পুলিশের বিরুদ্ধেও ছিল বিস্তর অভিযোগ। হরতাল চলাকালে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুকের ওপর পুলিশের নির্মম নির্যাতন, গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে আটক হয়ে বিশিষ্ট আইনজীবী এমইউ আহমেদের মর্মান্তিক মৃত্যু, বিএনপি নেতা ও ডিসিসির সদ্য বিদায়ী মেয়র সাদেক হোসেন খোকাকে পুলিশের সামনে দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাত, দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে আটক করে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে রেখে নির্মম নির্যাতন ও বস্ত্রহীন করার ঘটনা ছিল সবচেয়ে ন্যক্কারজনক ঘটনা। এ ছাড়াও রাজনৈতিক নেতাদের আটকের পর রিমান্ডে নিয়ে নির্মম নির্যাতনের ঘটনাও ছিল আলোচিত।
নরসিংদীর নির্বাচিত জনপ্রিয় মেয়র লোকমান হোসেনকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার অভিযোগ ওঠে খোদ সরকারেরই ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদের প্রতি। নিহত লোকমানের স্বজনদের দাবি, মন্ত্রীর নির্দেশেই তার ভাই সালাহউদ্দিন আহমেদ বাচ্চু ও আওয়ামী লীগ ক্যাডাররা মেয়র লোকমানকে হত্যা করে। এ ঘটনায় মামলার প্রধান আসামি মন্ত্রীর ভাইকে এখন পর্যন্ত পুলিশ গ্রেফতার করেনি। ‘সময়ের অভাবে আসামি ধরা যায়নি’ উল্লেখ করে আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকারের দেয়া বক্তব্যে আত্মীয়স্বজনরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান
শুধু আইনশৃঙ্খলা বিষয় পরিসংখ্যানই নয় ২০১১-র অন্যান্য কিছু পরিসংখ্যানও ছিল উদ্বেগজনক।
এক. স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, (২০.০৯.১১) বাংলাদেশে মাদকসেবীর সংখ্যা ৪৬ লাখ। এরা মাদকের পেছনে খরচ করছে বছরে প্রায় ২৫,০০০ কোটি টাকা।
দুই. পুলিশের দেয়া পরিসংখ্যানে জানা গেছে, ২০১১-র প্রথম নয় মাসে শুধু রাজধানীতেই গাড়ি চুরি বা ছিনতাই হয়েছে প্রায় ১,০০০।
তিন. যোগাযোগ মন্ত্রণালয় জানায়, (২২.০৯.১১) গত দশ বছরে ৪১৭৯১টি রোড অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায় (২২.০৯.১১) ১ জানুয়ারি ২০০১ থেকে ১৫.০৯.২০১১ পর্যন্ত ৩৬,৪৩৯টি রোড অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে।
চার. এসব সূত্রে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ২৭,৫৯৫ এবং আহত ২৫,৪৩৮।

হতাহত ব্যক্তিরা এখন পরিণত হয়েছেন পরিসংখ্যানে। এদের অন্যতম প্রগতিশীল মুভি-মেকার তারেক মাসুদ ও টিভি কর্মকর্তা মিশুক মুনীর। তারেক মাসুদ সেলিবৃটি ছিলেন বলে তার মৃত্যুর পর রোড অ্যাকসিডেন্ট সম্পর্কে মিডিয়া সোচ্চার হয়ে ওঠে। এই সময়ে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মজিবুর রহমান ফকির মন্তব্য করেন :
‘ধর্মমতে মুসলমানদের কোনো অকালমৃত্যু নেই। তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীর তাদের জন্য নির্ধারিত সময়েই মারা গেছে। তাদের জন্য দুঃখ লাগতে পারে। তবে এটাই বাস্তব।’

তার এই মন্তব্য বহুল সমালোচিত হয়। মানুষের মনে পড়ে বিএনপি আমলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরীর একটি দুর্ঘটনা পরবর্তী উক্তি, আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গিয়েছেন।

দুর্ঘটনার পর মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের এসব উক্তিতে আন্তরিকতা ও সমবেদনা নিশ্চয়ই থাকে। তবে তাদের আর্টিকুলেশন ভালো নয় বলে তারা সমালোচিত হন। তারা সমালোচনা অতিক্রম করতে পারেন যদি তারা দেশে জল ও স্থল পথে দুর্ঘটনা কমিয়ে আনার জন্য বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেন। কিন্তু সেটা তারা করেন না। মানুষ ভুলে যায়। পড়ে থাকে মৃত মানুষের স্মৃতি। আহত মানুষের দুঃসহ জীবন।
তারেক মাসুদের গুণী স্ত্রী এখন রোড অ্যাকসিডেন্ট-বিরোধী মুভি নির্মাণে মন দিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে সবাই আশা করবেন তিনি না চাইতেই সরকার তাকে প্রয়োজনীয় অনুদান দেবে।

বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা
২০১১-তে সেলিবৃটি নন এমন ব্যক্তির রোড অ্যাকসিডেন্টের মধ্যে সর্বাধিক আলোচিত ছিল ১১ জুলাইয়ে মিরেরসরাইয়ে একটি বাস দুর্ঘটনায় ৪৫ জন ছাত্রের নিহত হবার সংবাদ। এরা গিয়েছিল সরকারি নির্দেশে ‘বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা গোল্ড কাপ ফুটবল টুর্নামেন্টে’ অংশ নিতে। এই দুর্ঘটনার ফলে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতার নাম নিহতদের আত্মীয়স্বজনদের কাছে চিরবিস্বাদ হয়ে গিয়েছে। সব কিছুতেই বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতার ব্যবহার করা যে উচিত নয় আশা করি সেটা সরকার বুঝবে।

২০১১-তে আরেক সেলিবৃটি নিউজে এসেছেন। জনপ্রিয় লেখক হুমায়ুন আহমেদ ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হয়ে আমেরিকায় চিকিৎসাধীন আছেন। আপামর হিমুভক্তরা তার দ্রুত রোগমুক্তি কামনা করেছেন। তারা আশান্বিত এই কারণে যে, গায়িকা সাবিনা ইয়াসমিনও কথিত দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে সুস্থ হয়ে আবারও হৃদয়গ্রাহী গান শুনিয়েছেন ২০১১-তে।

গুড নিউজ ব্যাড নিউজ
পরিসংখ্যানের মতোই কয়েকটি সংখ্যা ২০১১-তে গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে।
২ : ঢাকা সিটি কর্পরেশনকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে আওয়ামী সরকার। ব্যাড নিউজ।
২০১১-তে দুই দফায় গ্যাসের দাম বেড়েছে। ব্যাড নিউজ।
৪ : ২০১১-তে চার দফায় জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। ব্যাড নিউজ।
৪৩ : বাংলাদেশের ৪৩ শতাংশ শিশুর উচ্চতা বয়সের তুলনায় কম। গার্মেন্টস গার্লদের দেখুন। ভবিষ্যতে আপনার বংশধররাও উচ্চতায় হয়তো ওদেরই মতো কম হবে। ব্যাড নিউজ।
৫৯ : সরকারি চাকরিতে অবসরের বয়স হয়েছে ৫৯। গুড নিউজ।
৬০ : ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ বাংলাদেশে ৬০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় মাত্রার ভূমিকম্প হয় ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১১-তে। এই ভূমিকম্প স্থায়ী ছিল ১ মিনিট ৪০ সেকেন্ড। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল সিকিমের রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৬ দশমিক ৮। পরিবেশবিদরা জানিয়েছেন, ভূমিকম্প ঝুকিতে রয়েছে রাজধানীর ৭২,০০০ ভবন। ভেরি ব্যাড নিউজ।
৬১ : দেশের ৬১টি জেলা পরিষদের প্রশাসক পদে রাজনৈতিক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। নিয়োগ প্রাপ্তদের একজন ছাড়া সকলেই আওয়ামী লীগের দলীয় পদাধিকারী ও স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। ব্যাড নিউজ।
২৬৬ : গতিহীন প্রশাসনে ওএসডি হয়েছে ২৬৬ কর্মকর্তা। ব্যাড নিউজ।
১৪.২৩ কোটি : ২০১১-তে পরিচালিত আদমশুমারিতে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৪.২৩ কোটি! এর মধ্যে অর্ধেকের কোনো অক্ষরজ্ঞান নেই। ভেরি ভেরি ব্যাড নিউজ।

পলিটিক্সে নতুন মুখ নতুন কালচার
রোগাক্রান্ত হয়ে ১৬ মার্চ ২০১১-তে লোকান্তরিত হন দুঃসাহসী বিএনপির সেক্রেটারি জেনারেল খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন। তার পদে ভারপ্রাপ্ত হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অল্প কয়েক মাসেই মির্জা আলমগীর জনমনে ভালো ইমেজ সৃষ্টি করেছেন যদিও তার বিরুদ্ধে এখনো তার দলের মধ্যে মেলা চক্রান্ত চলছে বলে গুজব আছে। প্রেস কনফারেন্সে মির্জা আলমগীর পাংচুয়াল হবার চেষ্টা করছেন (ঢাকার লেজেন্ডারি ট্রাফিক জ্যাম সত্ত্বেও) এবং প্রায়ই লিখিত টেক্সট থেকে বলছেন। তিনি ইকনমিক্সের ছাত্র ও সাবেক শিক্ষক। তার মতো আরো অনেক সৎ, যোগ্য ও শিক্ষিত ব্যক্তির প্রয়োজন বিএনপিতে। অ্যাপ্লাই করুন : ম্যাডাম খালেদা জিয়া, চেয়ারপার্সন, বিএনপি, রোড ৮৬, গুলশান ২ ঢাকা। টিআইএন নাম্বার যদি না থাকে এবং দুর্নীতির দায়ে যদি অভিযুক্ত হয়ে থাকেন তাহলে অ্যাপ্লাই করবেন না।

আওয়ামী লীগ পিছু হটেছে
২০১১-তে অপ্রত্যাশিতভাবে আওয়ামী লীগ সরকার দুটি ক্ষেত্রে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে।
এক. ঢাকার নবাবগঞ্জ ও দোহারের আড়িয়াল বিলে ন্যূনপক্ষে ৫০ হাজার কোটি টাকা খরচে বঙ্গবন্ধু এয়ারপোর্ট ও বঙ্গবন্ধু সিটি নির্মাণের লক্ষ্যে সরকার ১১ ডিসেম্বর ২০১০-এ যে ভূমি অধিগ্রহণের আদেশ দিয়েছিল, জানুয়ারি ২০১১-তে সেখান থেকে পিছু সরে আসতে হয়। ওই এলাকার জনগণ রুখে দাড়ায়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ওই ৫০ হাজার কোটি টাকা কোথায়? তা দিয়ে পদ্মা সেতু বানানো সম্ভব হচ্ছে না কেন?
দুই : দুর্নীতি বিষয়ে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক কঠোর অবস্থান নেয়ায় অভূতপূর্বভাবে পদ্মা সেতুর নির্মাণে অর্থায়ন করা হবে না বলে জানানো হয়। প্রথমে আওয়ামী সরকার ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের এই অবস্থানকে উপেক্ষা করলেও পরবর্তীতে তারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী আবুল হোসেনকে অন্য মন্ত্রণালয়ে বদলি করে। তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি। এখন পর্যন্ত ওয়ার্ল্ড ব্যাংক তাদের অবস্থানে অটল আছে। খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের কথিত দুর্নীতি বিষয়ে তৎপর মিডিয়া এখন হিসাব করে দেখতে পারে এই পদ্মা সেতুর দুর্নীতির মোট পরিমাণ ছিল আর সব কথিত দুর্নীতির যোগফলের বেশি। ক্যালকুলেটর চাইলে আমি পৌঁছে দেব চার্জ (ভ্যাটসহ) দিতে হবে।

ধর্ষণ ও কটূক্তি
অব্যাহত ধর্ষণের সংবাদ ২০১১-তে ছিল অব্যাহত। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময় অভিযোগ করা হয়েছে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ১৯৭১-এ অব্যাহতভাবে ধর্ষণ করেছিলেন ভানু সাহাকে, যিনি ইনডিয়াতে নিখোজ। তার চল্লিশ বছর পরে ২০১১-তে ঘটে যায় ঢাকার ভিকারুননিসা স্কুলে টিচার পরিমল জয়ধর কর্তৃক একাধিকবার জনৈক ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনা।

প্রথমে সরকার তাকে প্রটেকশন দেয়ার জন্য উত্তর বাংলায় ট্রান্সফার করলেও জনমতের চাপে শেষ পর্যন্ত পরিমল হন বরখাস্ত।
অন্য দুটি স্কুলে ২০১১-তে অন্য ধরনের ঘটনা ঘটে। ধানমন্ডি বয়েজ স্কুলে (২.৭.১১) মহানবীর বিরুদ্ধে টিচার মদনমোহন দাসের কটূক্তির ফলে ছাত্ররা স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল করে। এর মাত্র ১২ দিন পরে (১৪.৭.১১) টুঙ্গিপাড়া জিটি হাইস্কুলের টিচার শংকর বিশ্বাস মহানবীর বিরুদ্ধে কটূক্তি করেন। বোঝা যায়, শুধু ১৯৭১-এর ইতিহাস বিকৃতি নয়, ৫৭০ থেকে ৬৩২ খৃষ্টাব্দের ইতিহাস বিকৃতির প্রবণতা সমাজের একটি অংশে দেখা দিয়েছে।
শুধু ইতিহাস বিকৃতিই নয়, দিন বদলের আলোয় অঙ্গীকারবদ্ধ আওয়ামী লীগ নাম বদলে এবং নামকরণে মনোযোগী ছিল ২০১১-তে। ঢাকায় হতশ্রী শেরাটন হোটেলের নাম বদলে হয়েছে রূপসী বাংলা। আর বাংলাদেশ বিমানের নতুন বোয়িং প্লেনের নাম হয়েছে পালকিÑ যে পালকির উদ্বোধনী ফ্লাইটে (ঢাকা-টু-লন্ডন) যাত্রী ছিল খুব কম এবং (লন্ডন-টু-ঢাকা) ফ্লাইট ক্যান্সেল করা হয়।

নতুন আমেরিকান রাষ্ট্রদূত
নতুন ডিজিটাল অন্তর্বাস
তাহলে ২০১১ কি বাংলাদেশের জন্য কোনই ভালো সংবাদ নিয়ে আসেনি?
উত্তর, হ্যা। অন্তত দুটি ভালো সংবাদ আছে।

এক. বাংলাদেশে এসেছেন আমেরিকার নতুন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডাবলিউ মোজেনা। তিনি তার বাড়িতে দেয়া প্রথম রিসেপশনে অতিথিদের একটি গল্পচ্ছলে জানান, তার মা তাকে সবসময় বলতেন, কোনো কিছু চাইলে এবং তার জন্য ঈশ্বরের কাছে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করলে এবং সেই লক্ষ্যে একনিষ্ঠভাবে কাজ করলে, সেই ইচ্ছা পূরণ হয়। মোজেনা এর আগে বাংলাদেশে কাজ করেছিলেন। তখন থেকেই তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসতে চেয়েছিলেন। তার স্বপ্ন এখন পূরণ হয়েছে। মাই মাদার ওয়াজ রাইট। ড্যান মোজেনা এ কথা বলে গল্পের ইতি টানেন।
ওয়েলকাম টু বাংলাদেশ, এক্সিলেন্সি মোজেনা।

দুই. ২০১১-তে অস্ট্রেলিয়ার সিমাভিটা কম্পানি একটি বিশেষ ধরনের ডিজিটাল অন্তর্বাস উদ্ভাবন করেছে। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এটা খুব কাজে দেবে। এ অন্তর্বাস পরা কোনো বয়স্ক লোক মলমূত্র ত্যাগ করলে তথ্যটি তার দেখাশোনার দায়িত্বে নিয়োজিত সেবিকার কাছে লিখিত বার্তা আকারে পৌঁছে যাবে। কম্পানিটি অন্তর্বাসটির নাম দিয়েছে সিমসিস্টেম। তাদের দাবি, এটিই বিশ্বের প্রথম ইলেকট্রনিক অন্তর্বাস। সিমসিস্টেম অন্তর্বাসে একটি ডিসপোজেবল (ব্যবহারের পর ফেলে দিতে হয়) প্যাড আছে। এর সঙ্গে একটি সংবেদনশীল স্টৃপ রয়েছে, যা ওয়্যারলেস নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সেন্ট্রাল কম্পিউটারের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। ফলে অন্তর্বাস পরা কোনো বয়স্ক ব্যক্তি মলমূত্র ত্যাগ করলে তথ্যটি সঙ্গে সঙ্গে তার দায়িত্বে নিয়োজিত সেবিকার কাছে লিখিত বার্তা আকারে পৌছে যাবে। এ সেন্সর স্টৃপটি ডিসপোজেবল প্যাড থেকে বিচ্ছিন্ন করে পুনরায় ব্যবহার করা যাবে।
২০০৮ সালে এ অন্তর্বাসটি প্রথম পরীক্ষামূলক প্রয়োগ এবিসি টেলিভিশনে দেখানো হয়। এটির সফল সংস্করণ এখন অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস জুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

এই খবরটি ডিজিটাল বাংলাদেশ চালুকামী আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য একটি শুভ সংবাদ। কারণ পুরো ২০১১-জুড়ে এই সরকার যে বর্জ্য পদার্থ ছড়িয়ে দিয়েছে সেটা তাদের জন্য সহজতর হতো যদি তারা এই ডিজিটাল অন্তর্বাস ব্যবহার করতেন।
গুডবাই ২০১১।

১১.১২.২০১১

আরো খবর.......

জনপ্রিয় সংবাদ

রাণীশংকৈলে যথাযোগ্য মর্যাদায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন

বহু বিতর্কে ভরা ২০১১-র বাংলাদেশ

আপডেট টাইম : ০৬:০০:৪৪ অপরাহ্ণ, সোমবার, ৫ ডিসেম্বর ২০১১

সময়ের কন্ঠ রিপোর্ট।।

বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে মিষ্টি খাওয়ানোর রেওয়াজ আছে। কিন্তু ইংরেজি নববর্ষের প্রথম লগ্নে নাচ গান ও ডৃংকসের রেওয়াজ থাকলেও বছরের প্রথম দিনে মিষ্টি খাওয়ানোর রেওয়াজ নেই। তবুও তার ব্যতিক্রম করে দুটি মিষ্টি সংবাদ আপনাদের মনে করানো যেতে পারে।

এক. ১৮ ডিসেম্বরে ইনজিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশনে মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা সভায় বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া তার ভাষণের শুরুতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রয়াত জাতীয় নেতাদের প্রতি। সেই সময়ে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের নামের আগে বঙ্গবন্ধু শব্দটি ব্যবহার করেন।

এটি ছিল তার পক্ষ থেকে অন্যতম জাতীয় নেতার প্রতি ভদ্রতা ও সৌজন্যতার চমৎকার প্রকাশ।

দুই. এর ক’দিন পরে ২৬ ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা এবং অধুনালুপ্ত বাকশালের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাকের মরদেহ যখন সমাহিত করা হয় তখন তাকে শেষ বিদায় জানানোর জন্য পুষ্পার্ঘ নিয়ে বনানী করবস্থানে যান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত (উফ! এই ‘ভারপ্রাপ্ত’ শব্দটি তার আরো কতো দিন বহন করতে হবে?) সেক্রেটারি জেনারেল মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপির স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য মওদুদ আহমেদসহ প্রধান বিরোধী দলের আরো কিছু নেতা কর্মী। এটি ছিল তাদের পক্ষ থেকে প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের একজন প্রয়াত প্রধান নেতার প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান জানানোর অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
খালেদা জিয়া এই ভদ্রতা-সৌজন্যতা প্রকাশ না করলেও পারতেন। মির্জা আলমগীর ও মওদুদ আহমেদ শ্রদ্ধা ও সম্মান নিবেদন না করলেও পারতেন। তারা নীরব থাকতে পারতেন। অথবা আওয়ামী নেত্রী- নেতাদের স্ট্যান্ডার্ডে নেমে যেতে চাইলে মিথ্যা প্রচারণাও করতে পারতেন। সেটা তারা করেন নি।

মুক্তিযোদ্ধা কে?
এর কদিন আগেই কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঠিক তাই করেছিলেন। পড়–ন দৈনিক মানবজমিন (১৫.১২.১১)-র রিপোর্ট :
মুক্তিযুদ্ধে সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ভূমিকা নিয়ে আবারও প্রশ্ন তুললেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, যুদ্ধের সময় তাকে কয়েক দফায় সাসপেন্ড করা হয়েছিল। তিনি রণক্ষেত্রে যুদ্ধ করেছেন তারও তেমন প্রমাণ মেলেনি। বরং তিনি রিটৃট (পশ্চাৎপদ) মেজর হিসেবে পরিচিত ছিলেন। গায়ে গুলি লাগবে, বোমা পড়বে এই ভয়ে তিনি দূরে দূরে থাকতেন। ঘটনাচক্রে তিনি একটি সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এটি ছিল বাস্তবতা। গতকাল শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলনে কেন্দ্রে আয়োজিত আলোচনা সবায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, জিয়াউর রহমান যুদ্ধের সময় আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে চাকরি করতেন। তাকে পদোন্নতি দিয়ে মেজর থেকে মেজর জেনারেল করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। তখন দেশ চালাতো আওয়ামী লীগ সরকার। আওয়ামী লীগ যুদ্ধ করেনিÑ খালেদা জিয়ার এই বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, যে সরকার যুদ্ধ পরিচালনা করেছে সেই সরকারের অধীনে চাকরি করতেন জিয়া। এ বিষয়টি তাদের জানা উচিত। দেশে কারা মুক্তিযুদ্ধ করেছে ইতিহাসই তার সাক্ষী। বিএনপি নেত্রীর কাছ থেকে আমাদের মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট নিতে হবে না। তিনি বলেন, আমাদের পরিবারের প্রতিটি সদস্য মুক্তিযুদ্ধ করেছে। আমার মায়ের সঙ্গে শেখ কামালকে বন্দি করা হয়েছিল। পরে সে গেরিলা কায়দায় সেখান থেকে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। তার এই পালিয়ে যুদ্ধে অংশ নেয়ার ঘটনা অনেকের জন্য দৃষ্টান্ত ছিল। শেখ ফজলুল হক মণি সারা দেশের বিভিন্ন সেক্টরে ঘুরে ঘুরে কোথায় কে যুদ্ধ করছে কার কাছে কি অস্ত্র ছিল তার তালিকা করতো। এরকম একটি খাতাও পাওয়া গেছে। এটি ডকুমেন্ট হিসেবে রাখা আছে। শুধু মুক্তিযুদ্ধ নয়, প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে আমাদের ভূমিকা আছে।

তিনি বলেন, সেই স্কুল জীবনে স্কুলের দেয়াল টপকে আমার আন্দোলনে যাওয়া শুরু।

শেখ হাসিনা এই ভাষণে তার অন্যান্য আত্মীয়দের কথা বললেও তার পিতার কথা বলেন নি। কেন? তিনিও কি রিটৃট করে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন? করে থাকলে কোথায় করেছিলেন?
এই ভাষণে জানা গেল শেখ হাসিনা স্কুলের দেয়াল টপকে আন্দোলনমুখী জীবন শুরু করেছিলেন। আমরা কি বলবো শেখ হাসিনাও ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা? অপর দিকে মুক্তিযোদ্ধা জিয়াকে যদি সমালোচনা করতে হয় তাহলে সেটা অন্তত শুদ্ধ ভাষায় হওয়া বাঞ্ছনীয়। রিটৃট মেজর নয়Ñ রিটৃটিং মেজর বলা উচিত ছিল। বৃটেনের মার্গারেট থ্যাচারের ইংরেজি উচ্চারণ তেমন ভালো ছিল না। প্রধানমন্ত্রী হবার পর তিনি ইংরেজি ভাষা ও উচ্চারণে নিয়মিত লেসন নিয়ে নিজেকে উন্নত করেছিলেন। শেখ হাসিনা এই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে পারেন।

কুটিল, কুৎসিত ও কুরুচিপূর্ণ
২০১১ জুড়ে জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে এই ধরনের অপপ্রচার চলেছে। অন্যান্য আওয়ামী নেতারা বলেছেন, জিয়া ছিলেন ছদ্মবেশী পাকিস্তানি চর! এই অপপ্রচার ছিল কুটিল, কুৎসিত ও করুচিপূর্ণ। উল্লেখ্য, একটি সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশের অর্থনীতির বুনিয়াদ প্রতিষ্ঠাতা বিএনপি আমলের অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের মৃত্যুর পর শেখ হাসিনা কোনো শোক প্রকাশ করেননি। একই ভাবে বিএনপি নেতা ও সেক্টর কমান্ডার হামিদুল্লাহ খান বীর প্রতীকের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেননি প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি। সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় তার জানাযায় স্পিকার আব্দুল হামিদ ছাড়া কোনো মন্ত্রী, এমপি যাননি।

মার্চ মানে কি?
১৭ অক্টোবর ২০১১-তে শ্রীপুরে মাওনা বহুমুখী হাই স্কুল মাঠে আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক জনসভায় শেখ হাসিনা বলেন, রোড মার্চ মানে পায়ে হেটে কর্মসূচি পালন। কিন্তু বিরোধী দলীয় নেত্রী গাড়িতে চড়ে কার র‌্যালি করলেন। তিনি গাড়িতে চড়িয়া হাটিয়া চলিলেন। এ যেন ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ হাটিয়া চলিল। রোড শোতে তারা দুই হাজার দামি গাড়ি প্রদর্শন করলেন। এতো গাড়ির টাকা কোথায় পেলো। অতীতে তারা লুটপাট ছাড়া আর কিছুই করেনি। এখন গাড়ি নিয়ে রোড মার্চের নামে পিকনিক করে বেড়াচ্ছেন। প্রতিটি গাড়ির নম্বর-প্লেট নিয়ে খুজে বের করতে হবে, কোথা থেকে এ সব গাড়ি এসেছে। গাড়ি কেনার টাকার উৎস কোথায়, তার হিসাব নেয়া হবে।

শেখ হাসিনার এই মন্তব্যেও তার ইংরেজি ভাষায় দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। ইংরেজি মার্চ শব্দটির অর্থ শুধু রাস্তায় হেটে যাওয়াই নয়। তিনি যদি বিবিসি ইংলিশ ডিকশনারি (পৃষ্ঠা ৬৮৩) খুলে দেখেন তাহলে জানবেন মার্চের একাধিক অর্থ হতে পারে। যেমন, ঞযব সধৎপয ড়ভ ংড়সবঃযরহম রং রঃং ংঃবধফু ফবাবষড়ঢ়সবহঃ ঢ়ৎড়ংৎবংং (কোনো কিছুর মার্চ অর্থ তার নিয়মিত উন্নতি অথবা অগ্রযাত্রা)।
খালেদা জিয়া অক্টোবর ২০১১-তে সিলেট অভিমুখে যে রোড মার্চ শুরু করেন সেটা নিয়মিতভাবে তিনি করে এসেছেন। তিনি গিয়েছেন উত্তর দিকে চাপাইনবাবগঞ্জে এবং দক্ষিণ পশ্চিম দিকে খুলনা-যশোরে। জানুয়ারি ২০১২-র দ্বিতীয় সপ্তাহে যাবেন দক্ষিণ দিকে ফেনী ও চট্টগ্রামে। সুতরাং তার এই নিয়মিত ও অগ্রগামী রাজনৈতিক অভিযানকে বিবিসির ডিকশনারি মোতাবেক রোড মার্চ বলাই যথার্থ।

বুর্জোয়া পলিটিক্সে নাজুক প্রশ্ন করবেন না
প্রধানমন্ত্রী এই রোড মার্চে অংশগ্রহণকারী গাড়ি কেনার টাকার উৎস কোথায় জানতে চেয়েছেন। এর প্রতিক্রিয়ায় যদি কেউ বিদেশে অবস্থানরত প্রধানমন্ত্রীর নিকটাত্মীয়দের গাড়ি এবং বাড়ি কেনার ডলার-পাউন্ডের উৎস কোথায় জানতে চায় তাহলে তিনি কি উত্তর দেবেন?
বস্তুত বুর্জোয়া রাজনীতিতে এসব প্রশ্ন পলিটিশিয়ানদের (আওয়ামী-বিএনপি সবারই) না তোলাই শ্রেয়। এই ধরনের প্রশ্নের উত্তর অনেক ইংরেজি-বাংলা পত্রিকার সম্পাদক, টিভি-রেডিওর কর্মকর্তারাও দিতে পারবেন না।
গাড়ির নাম্বার টোকাটুকির সম্ভাবনার পর মানুষ আরো কিছুটা সতর্ক হয়ে গিয়েছে। অনেকেরই বিশ্বাস বর্তমান সরকার টেলিফোন সংলাপ ট্যাপিং (ঞধঢ়ঢ়রহম)-এ যথেষ্ট কর্মী নিয়োগ করেছে। ২০১১-তে অনেকেই মোবাইল ফোনে রাজনৈতিক আলোচনা বাদ দিয়েছেন।

বিতর্কিত ডেড রেকনিং
মুক্তিযুদ্ধে শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমানের ভূমিকা কি ছিল ২০১১-তে সেই বিতর্কে আরেকটি ইসু যোগ হয়। পড়–ন দৈনিক আমার দেশ (১৭.১২.১১)-র রিপোর্ট :
সঠিকভাবে কেউই জানেন না ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে কত মানুষ তাদের জীবন হারিয়েছিল। কিন্তু নিঃসন্দেহে ওই যুদ্ধে অনেক মানুষ জীবন দিয়েছে। নিরপেক্ষ গবেষকরা মনে করেন, এই সংখ্যা তিন থেকে পাচ লাখের মধ্যে। বাংলাদেশ সরকার মনে করে, ১৯৭১-এ মারা গেছে ৩০ লাখ বাঙালি।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪০ বছর পূর্তিতে বিবিসি নিউজের এক রিপোর্টে এ তথ্য দেয়া হয়েছে।”
মার্ক ডামেট। বাংলাদেশের যুদ্ধ : যে রিপোর্ট ইতিহাস পরিবর্তন করেছে’ শীর্ষক এ রিপোর্টে সাংবাদিক অ্যান্টনি মাসকারেনহাস ১৯৭১ সালের ১৩ জুন বৃটেনের সানডে টাইমস পত্রিকায় যে রিপোর্ট পাঠিয়েছিলেন তার মধ্যে দিয়েই যে পাকিস্তানি নৃশংসতার কাহিনী বিশ্ববাসী পুরোপুরি জানতে পেরেছিল তা-ই তুলে ধরা হয়েছে।
বিবিসি টেলিভিশন বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৭টার খবরে অধ্যাপক শর্মিলা বোসের সাক্ষাৎকার প্রচার করেছে। এই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ বাঙালি মারা গেছে। এর আগে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোসের এ নিকটাত্মীয়ের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রকাশিত গ্রন্থ ‘ডেড রেকনিং’- ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। এই বইয়ে তিনি বলেন, ’৭১-এ পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে যে গণধর্ষণের অভিযোগ তোলা হচ্ছে তা অপপ্রচার। এ তথ্য ঠিক নয়।’
এখানে জানিয়ে রাখা উচিত শর্মিলা বোস-এর এই বই উবধফ জবপশড়হরহম, গবসড়ৎরবং ড়ভ ঃযব ১৯৭১ ইধহমষধফবংয ডধৎ (ডেড রেকনিং অর্থাৎ মৃতের সংখ্যা গণনা) ২০১১- তে ঘটা করে লন্ডন ও নিউইয়র্কে লঞ্চ করা হয়েছে। প্রকাশক।

নতুন কয়েকটি বিতর্ক
২০১১-তে চল্লিশ বছর আগের পুরনো ঘটনাগুলো নিয়ে বিতর্ক শুরু হবার পাশাপাশি নতুন কিছু ঘটনা দিয়ে প্রচ- বিতর্কও শুরু হয়েছে।
২০১১-তে বহুল আলোচিত সংবিধান (পঞ্চদশ সংশোধন) বিল, স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) সংশোধন বিল, উপজেলা পরিষদ (সংশোধন) বিল, অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ (সংশোধন) বিলসহ উল্লেখযোগ্য আলোচিত বিল পাস হয়। এ বছর চারটি অধিবেশনে মোট ২২টি বিল পাস হয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দুই দফা বিভক্তি ভোটের মাধ্যমে সংবিধান (পঞ্চদশ সংশোধন) বিল-২০১১ বিদায়ী বছরের ৩০ জুন পাস হয়। সংবিধানে ৫৫টি দফা যুক্ত করে বিলটি পাসের পক্ষে ২৯১টি এবং বিপক্ষে একটি ভোট পড়ে। সংবিধানের এ সংশোধনী প্রত্যাখ্যান করেছে বিএনপি-জামায়াত জোট। সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার জন্য বিএনপি দাবি জানিয়ে চলেছে।
বিরোধী দলবিহীন প্রায় মৃত সংসদে মাত্র চার মিনিটে ঢাকা সিটি করপোরেশনকে (ডিসিসি)ভাগ করা সংক্রান্ত বিল পাস হয়েছে। উপজেলা পরিষদ (সংশোধন) বিলটি পাস হয়েছে মাত্র পাচ মিনিটে। ২৯ নভেম্বর তড়িঘড়ি করে মাত্র নয় মিনিটে বিল দু’টি পাস হয়। এ দিন সংসদ চলে মাত্র ১০ মিনিট। ডিসিসি বিভক্তিকরণ বিলে বিরোধী দলের ১১ জন, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাসদের মইনুদ্দীন খান বাদল, শাহ জিকরুল আহমেদ ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ফজলুল আজিম বিলের ওপর জনমত যাচাই-বাছাই ও সংশোধনী আনলেও সংসদে তাদের অনুপস্থিতির কারণে তা নাকচ হয়ে যায়। ডিসিসি ভাগ করার প্রতিবাদে বিএনপি-জামায়াত জোট রাজধানীতে হরতাল পালন করে।
নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বিরোধিতার পরও উপেজেলা পরিষদে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কর্তৃত্ব বহাল রেখেই উপজেলা পরিষদ (সংশোধন) বিলটি পাস হয়। দেশের নাগরিক ও স্থায়ী বাসিন্দাদের কাছে অর্পিত সম্পত্তি ফেরত দেওয়ার বিধান রেখে বহুল আলোচিত অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ (সংশোধন) বিল পাস হয়। সাংবাদিকদের গ্রেফতারি পরোয়ানার পরিবর্তে শুধু সমন জারির ব্যবস্থা রেখে ফৌজদারি কার্যবিধি (সংশোদনী) বিল পাস হয়।
২০১১-তে এ বছর সংসদ অধিবেশনের কার্যদিবস ছিল ৮০টি। এর মধ্যে বিএনপি-জামায়াত জোট সংসদে গেছে আট কার্যদিবস। আর বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া গেছেন এক কার্যদিবস। সরকার গঠনের পর নবম জাতীয় সংসদের একাদশ অধিবেশনের মোট ২৫৪ কার্যদিবসের মধ্যে বিরোধী দল সংসদে গেছে মাত্র ৫৪ কার্যদিবস। এর মধ্যে খালেদা জিয়া গেছেন ছয় দিন। ১১টি অধিবেশনের মধ্যে দ্বিতীয়, তৃতীয়, ষষ্ঠ, সপ্তম, নবম, দশম ও একাদশ অধিবেশনে পুরোপুরিই অনুপস্থিত ছিলেন তারা। বিরোধী দল পঞ্চম অধিবেশনে যোগ দেয় মাত্র এক দিনের জন্য। চলতি সংসদের দশম অধিবেশন পর্যন্ত ২৪১ কার্যদিবসের মধ্যে আটজন মন্ত্রীই ১৫০ কার্যদিবসের কম সংসদে উপস্থিত ছিলেন। ১০ জন এমপি রয়েছেন যারা ১০০ কার্যদিবসেরও কম সংসদে উপস্থিত ছিলেন। নবম জাতীয় সংসদ অধিবেশন শুরুর প্রথম দিক থেকেই কোরাম (৬০) সংকটের কারণে প্রায় প্রতিদিনই দেরিতে অধিবেশন শুরু হয়েছে। তবে ২৪ ফেব্রুয়ারি কোরাম সংকটের কারণে প্রথমবারের মতো বৈঠক মুলতবি করা হয়।
বিরোধী দলগুলোর সংসদে অনুপস্থিতি তাদের দলের মধ্যেও সমালোচিত হয়েছে। অনেকেই বলেন, যদি আওয়ামী লীগের নেত্রীসহ অন্যান্য আওয়ামী সংসদ সদস্যরা মার্জিত ও শালীন ভাষা আয়ত্ত করতে পারেন, তাহলে হয়তো বিরোধী দলীয় এমপিরা সংসদে ফিরে যেতে পারেন।

নির্বাচন কমিশন বিতর্ক
এই বছরে কেয়ারটেকার সরকার বিতর্কের পাশে আরো দুটি বিতর্ক হয়েছে নির্বাচন কমিশনকে গিরে। এক. নির্বাচন কমিশনের নতুন সদস্য করা হবেন এবং দুই. ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) আগামী নির্বাচনে ব্যবহার করা উচিত হবে কিনা? বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার নির্বাচন থেকে শেষ মুহূর্তে প্রার্থী তৈমুর আলম খন্দকার-কে সরে যেতে অনুরোধ করে। তৈমুর নির্বাচনী ক্যামপেইনে প্রচুর খরচ করা সত্ত্বেও কেন্দ্রের অনুরোধে নির্বাচন থেকে সরে দাড়ান। দলীয় শৃঙ্খলা ও আনুগত্যের অনুকরণযোগ্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন তিনি।
এই নির্বাচনে বিজয়ী হন ড. সেলিনা হায়াৎ আইভী। বিপুল ভোটে পরাজিত হন শেখ হাসিনার মনোনীত প্রার্থী শামীম ওসমান। এই দুর্ঘটনার ড্যামেজ লিমিটেশনের জন্য নির্বাচনের পরে শেখ হাসিনা তলব করেছিলেন প্রথমে শামীম ওসমানকে এবং তাকে পাশের ঘরে রেখে পরে আইভীকে। শেখ হাসিনা এরপর দুজনকে পাশে রেখে ফটো তোলেন এবং আশা প্রকাশ করেন এই ছবি দলীয় সংহতি রক্ষায় সহায়ক হবে। তাই কি? শেখ হাসিনা যদি ফরগিভ করে ফরগেট না করেনÑ তাহলে আইভীও কি সেটা করতে পারেন না? কিন্তু আইভী প্রশংসনীয় ভদ্রতা শিখিয়েছেন যদিও তার দল তার (আইভীর) একনিষ্ঠ আনুগত্যের অধিকার হারিয়েছে।

ফরগিভ-ফরগেট বৃত্তান্ত
ফরগিভ-ফরগেটের ইসুতে ২০১১-তে কয়েকবারই লক্ষ্য করা গেছে শেখ হাসিনা ফরগেটও করেছেন- বিশেষত তিনি নিজে যখন অভিযুক্ত হয়েছেন। পড়–ন আমার দেশ (০৫.০৬.১১)-এ জাকির হোসেনের একটি রিপোর্ট :
তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়ে প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে ফর্মুলা দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন আমরা রিজিড (অনড়) অবস্থানে নই। সংসদে এসে কথা বলুন। কোনো ফর্মুলা থাকলে বলুন। একই সঙ্গে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সমালোচনা করে বলেছেন, এই সরকারের ভাবমর্যাদা সামরিক সরকারকেও হার মানায়। এর কারণেই দেশে এক-এগারোর মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন চলাকালে ১৯৯৫ সালের ১৬ নভেম্বর গাইবান্ধায় আয়োজিত এক সমাবেশে বলেছিলেন, জনগণের ভাত ও ভোটের অধিকার নিশ্চিত করতে তার দল আন্দোলনে নেমেছে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে জনগণ আজ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ। অন্য কোনো ফর্মুলা গ্রহণযোগ্য হবে না।

একই সঙ্গে তিনি বর্তমান মহাজোটের অন্যতম শরিক এবং ওই সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের অন্যতম সহযোগী জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সম্পর্কে বলেছিলেন, দুর্নীতি ও ভোট ডাকাতির কারণে এরশাদ সরকারকে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে দেয়া হয়েছে। অন্য দিকে এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার কারণেই দেশে এক-এগারোর মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল এবং রাজনৈতিক সরকার থাকলে ১/১১ আসতো না, এমন কথা বললেও ওয়ান-ইলেভেনের সরকারের আমলে ২০০৭ সালের ১৫ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র যাওয়ার প্রাক্কালে বিমানবন্দরে তিনি বলেছিলেন, আমাদের আন্দোলনের ফসল এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তারা ফেল করলে আমাদেরও লজ্জা পেতে হবে। বিএনপি-জামায়াত আমাদের দোষারোপ করবে। আশা করব, এ ধরনের পরিস্থিতি যেন না হয়। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে তিনি ওয়ান-ইলেভেনের সরকারের সকল কার্যক্রমের বৈধতা দেয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারতো মহাচোরদেরই ধরছেন। এতে আমাদের ভীত ও আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। দুশ্চিন্তার কি আছে, আমরা ক্ষমতায় গেলে তাদের এসব কার্যক্রম র‌্যাটিফাই করে দেব। দেশের মানুষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কার্যক্রমের প্রশংসা করছে। এই সুন্দর পরিবেশ বজায় থাকতেই নির্বাচন সম্পন্ন করা উচিত।
এসব খবর ওই সময়ের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়। দৈনিক আমার দেশ ও দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত দুটি প্রতিবেদনের অংশবিশেষ তুলে ধরা হলোÑ
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া অন্য কোনো ফর্মুলা মানব না : হাসিনা
সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে জনগণ আজ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ। অন্য কোনো ফর্মুলা গ্রহণযোগ্য হবে না। (দৈনিক বাংলা : ১৭ নভেম্বর ’৯৫)

যুক্তরাষ্ট্র যাওয়ার প্রাক্কালে বিমানবন্দরে শেখ হাসিনা
ক্ষমতায় গেলে বর্তমান সরকারের সব কাজের বৈধতা দেব

বর্তমান সরকারের কার্যক্রমের বৈধতা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা গতকাল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগের আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার তো মহাচোরদেই ধরছেন। এতে আমাদের ভীত বা আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। দুশ্চিন্তার কি আছে? আমরা ক্ষমতায় গেলে তাদের এসব কার্যক্রম ‘র‌্যাটিফাই’ করে দেব। শেখ হাসিনা দ্রুত নির্বাচনের আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, অনির্দিষ্টকালের জন্য নির্বাচন বন্ধ রাখা ঠিক হবে না। তিনি বলেন, দেশের মানুষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কার্যক্রমের প্রশংসা করছে। এই সুন্দর পরিবেশ বজায় থাকতেই নির্বাচন সম্পন্ন করা উচিত। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কর্মকা- প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে। মানুষের প্রশংসা পেয়েছে। এই পরিস্থিতি থাকতে থাকতে নির্বাচন দিলে দেশের জনগণ ও সরকার উভয়ের জন্য মঙ্গল হবে। ভালো কাজ বেশি দিন ধরে রাখা যায় না। তিনি বলেন, ‘সভা থাকতেই কীর্তন শেষ করতে হবে’। …. তিনি আরো বলেন, আমাদের আন্দোলনের ফসল এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তারা ফেল করলে আমাদেরও লজ্জা পেতে হবে। বিএনপি-জামায়াত আমাদের দোষারোপ করবে। আশা করব, এ ধরনের পরিস্থিতি যেন না হয়। (দৈনিক আমার দেশ : ১৬ মার্চ ২০০৭)

ফরগেট প্রসঙ্গে হয়তো কেউ হাসিনাকে মনে করিয়ে দিতে পারেন অতীতে তিনি ৫৭ বছর বয়সে রিটায়ার করার কথা বলেছিলেন। সেটা তিনি এখন ভুলে গিয়েছেন। দশ টাকা কেজিতে চাল খাওয়ানোর কথাও ভুলে গিয়েছেন।

শেখ হাসিনা যে তার কথার বরখেলাপ করে সম্পূর্ণ উল্টো পথে হাটতে পারেন তার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় ২০১১-তে। পড়–ন আমার দেশ (২১.১২.১১) পত্রিকার আরেকটি রিপোর্ট :

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক ও সেনাসদস্যদের মধ্যে ২০০৭ সালে সংঘর্ষের ঘটনায় সম্পৃক্ততার দায়ে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ ও তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদকে বিচারের মুখোমুখি দাড় করানোর সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি।
কমিটি জরুরি সরকারের এই শীর্ষ দুই কুশীলব ছাড়াও ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকায় ডিজিএফআইয়ের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী দুই সেনাকর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব:) এটিএম আমিন ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) চৌধুরী ফজলুল বারী, কর্নেল শামসুল আলম খানের (কর্নেল। শামস) বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইনে শাস্তির সুপারিশ করেছে। কমিটি এর বাইরে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতায় পুলিশের তৎকালীন আইজি নূর মোহম্মদের বিরুদ্ধেও বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংঘর্ষের ঘটনায় গঠিত শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় উপ-কমিটির এসব সুপারিশসংবলিত প্রতিবেদন সংসদীয় মূল কমিটিতে উপস্থাপন করা হলে তা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি রাশেদ খান মেননের সভাপতিত্বে গতকাল সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটির ২৪তম বৈঠকে প্রতিবেদনের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এর আগে গত ৮ ডিসেম্বর উপ-কমিটির বৈঠকে প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা হয়। সকালে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কমিটির সদস্য শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, হুইপ মির্জা আজম, কাজী ফারুক কাদের ও মো. শাহ আলম অংশ নেন।
বৈঠক শেষে রাশেদ খান মেনন সংসদ ভবনের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ বৃফিংয়ে সিদ্ধান্তগুলো তুলে ধরেন। কমিটির পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ তুলে ধরে তিনি বলেন, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমদ ও সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ এ ঘটনার জন্য দায়ী; কারণ ওই সময় সরকারের এই শীর্ষ দুই কর্ণধার ইচ্ছাকৃত নির্লিপ্ত থেকে নিশ্চেষ্ট ভূমিকা পালন করেন। তারা ঘটনা নিরসনে কোনো চেষ্টাই করেননি। কমিটির কাছে আসা তথ্য-উপাত্তের মাধ্যমে এটাই প্রমাণিত হয়। ফখরুদ্দীন ও মইন এ ঘটনার যাবতীয় নির্দেশনা দিয়েছেনÑ যার জন্য তারা কোনোভাবেই এ ঘটনার দায় এড়াতে পারেন না।

একই যাত্রায় কেন পৃথক ফল?
কিন্তু ধারণা হয়েছে মইন-ফখরুদ্দীনের সহযাত্রী ১/১১-এর আরেক চক্রান্তকারী লে. জে. মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে আবারও পুরস্কৃত করছে আওয়ামী লীগ সরকার। নতুন করে তার চাকরির মেয়াদ আরো ছয় মাস বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। এর আগে তার চাকরির বয়স শেষ হওয়ার পর তিন মাস করে দুই দফায় মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। বিতর্কিত এই সেনাকর্মকর্তা বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে কর্মরত আছেন।

একই যাত্রায় কেন পৃথক ফল হচ্ছে? জেমস বন্ড হয়তো এই রহস্যের সমাধান করতে পারতেন। তবে কেউ কেউ বলেন, মতিউর রহমান-মাহফুজ আনাম প্রণীত এবং মইন-ফখরু কর্তৃক বাস্তবায়িত মাইনাস-টু ফর্মুলার এক পর্যায়ে যখন হাসিনা ও খালেদা সাবজেলে ছিলেন তখন তাদের দুজনকেই পৃথিবী থেকে মাইনাস করে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। শোনা যায়, সেই সময়ে এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন মাসুদ। কারণ এক দিকে তিনি রক্ষীবাহিনীর সাবেক সদস্য রূপে শেখ মুজিবের প্রতি কৃতজ্ঞ ছিলেন এবং অন্য দিকে খালেদা জিয়ার ভাই এসকান্দারের ভায়রা-ভাই সুবাদে খালেদার সঙ্গে আত্মীয়তার বন্ধন ছিল।
তবে এই থিওরির সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। শুধু দেখা যাচ্ছে মাসুদ নির্বিবাদে ছিলেন ২০১১-তে।

সমালোচিত র‌্যাব
মইন-ফখরুর রেখে যাওয়া প্রতিষ্ঠান ও তাদের অঙ্গপ্রতিষ্ঠানসমূহ এ বছরে অভিযুক্ত হয়েছে হত্যা ও গুপ্তহত্যার দায়ে। মাসুদ ফিরে এলে কি এসব প্রতিষ্ঠান হিংসা-প্রতিহিংসা মুক্ত হবে?
২০১১-তে উইকিলিকসে ফাস হওয়া তথ্যে জানা যায় (যুগান্তর ১৪.০৯.১১) :
র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে (র‌্যাব) নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে ঢাকার মার্কিন দূতাবাস থেকে একটি তারবার্তা পাঠানো হয় ২০০৫ সালে। তারবার্তায় বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে অনেকের প্রশংসা কুড়ালেও র‌্যাব বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের বিষয়টি নিয়ে সমালোচিত। সম্প্রতি উইকিলিকস এ গোপন তারবার্তাটি প্রকাশ করেছে।
কয়েকটি গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে দূতাবাস ওয়াশিংটনকে জানায়, বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- ছাড়াও র‌্যাব ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। দেশের কয়েকটি স্থানে চাদা নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে র‌্যাবের বিপক্ষে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অপরাধের সঙ্গে র‌্যাব সদস্যরা জড়িয়ে পড়লে তাদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নেবে।
তারবার্তায় বলা হয়েছে, ক্রসফায়ার র‌্যাবের আরেকটি সমালোচিত বিষয়। এর প্রায় সব ঘটনার বিবরণ একই রকম। তারবার্তায় জানানো হয়েছে, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর বলেছিলেন, যখন র‌্যাবের হাতে সন্ত্রাসীরা ক্রসফায়ারে মারা যায়, তখন মানবাধিকার কর্মীরা সোচ্চার হয়ে ওঠেন। কিন্তু সন্ত্রাসীদের হাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের জীবন গেলে তারা কোন কথা বলেন না।

গুপ্তহত্যার জন্য দায়ী সরকার
বিরোধী দলগুলোর মতে র‌্যাবের সেই ট্র্যাডিশন বজায় রেখেছে বর্তমান আওয়ামী সরকার। পড়–ন প্রথম আলো (১৫.১২.২০১১)-র একটি রিপোর্ট :
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ করে বলেছেন, ‘গুপ্তহত্যা রাষ্ট্রসমর্থিত। বিরোধী দলকে দমন-পীড়নের জন্য বর্তমান সরকার গুপ্তহত্যাকে রাজনীতির একমাত্র অনুষঙ্গ করেছে।’
এ হত্যাকা-ের সঙ্গে যে সরকার জড়িত তাতে কোনো সন্দেহ নেই। উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, এখন এসব হত্যাকা-ে জড়িত থাকার জন্য সবার ইঙ্গিত সরকারের দিকে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, তিনি পত্রপত্রিকার মাধ্যমে এসব গুপ্তহত্যা সম্পর্কে জানতে পেরেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপির এই নেতা বলেন, সরকার যে এর সঙ্গে জড়িত নয়, তা সরকারেই অবিলম্বে প্রমাণ করতে হবে।
একই সঙ্গে যশোর জেলা বিএনপির অর্থবিষয়ক সম্পাদক নাজমুল ইসলামকে হত্যার ঘটনায় ১৭ ডিসেম্বর যশোরে হরতাল ডাকা হয়েছে। আজ সংবাদ সম্মেলনে এ হরতালে কেন্দ্রীয়ভাবে সমর্থন দিয়েছে দলটি।

অরাজকতার দিকে দেশ
খুন, গুম, গুপ্তহত্যা প্রভৃতি বাংলাদেশকে এক ভয়াবহ অরাজকতার দিকে টেনে নিয়ে গেছে ২০১১। দেশ ও বিদেশে মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ নিয়ে সোচ্চার হয়েছে। পড়–ন আমার দেশ (২৬.১২.১১)-তে নাছির উদ্দিন শোয়েবের রিপোর্ট :
শেখ হাসিনার তিন বছরে মানবাধিকার লংঘন :
খুন ১২ হাজার
বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- ৩৫৯
গুম ১০০
গুপ্তহত্যার পর লাশ উদ্ধার ১৬
ফাসির দ-প্রাপ্ত আসামি মুক্তি ২২
সাংবাদিক নিহত ৪; গ্রেফতার ৩
মোট অপরাধ ৫ লাখ ৩৭ হাজার ৬৪২

ক্রসফায়ার, গুপ্তহত্যা, নৃশংস খুন ও গুমসহ সহিংস ঘটনায় মহাজোট সরকারের তিন বছরে আইনশৃঙ্খলা এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি ছিল চরম উদ্বেগজনক। র‌্যাব ও পুলিশের বিতর্কিত কর্মকা-ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপক অভিযোগ ওঠে। এর মধ্যে কয়েকটি ঘটনার ওপর বিচার বিভাগীয় তদন্ত চলছে। নির্যাতিত ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলো আদালত ও প্রশাসনের কাছে গিয়েও ন্যায়বিচার পায়নি।

এমন বহু অভিযোগ রয়েছে। পেশাদার খুনি, দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী, চাদাবাজ ও বহু দাগি অপরাধীকে দলীয় বিবেচনায় আইনের আওতায় আনা হয়নি। বরং মৃত্যুদ-প্রাপ্ত ২২ আসামিকে কারাগার থেকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। চাদাবাজি, টেন্ডারবাজি, জনপ্রতিনিধিদের প্রকাশ্যে হত্যা, বিরোধী মতের ব্যক্তিদের নামে মিথ্যা মামলা, আটকের পর রিমান্ড এবং সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে। ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলার তেমন কোনো উন্নতি হয়নি।

স্থানীয় গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে চলতি বছরের শেষার্ধে নাম বদল করে নতুন কায়দায় শুরু হয় গুম-গুপ্তহত্যা। বিভিন্ন স্থান থেকে শাদা পোশাকধারীদের হাতে আটক প্রায় ১শ’ জনের খোজ মেলেনি। রাজধানী ঢাকাতেই চলতি বছর গুম হয়েছে ৩০ জন। এ পর্যন্ত ১৬ জনের লাশ নদী, হাওর ও জঙ্গল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। বিএনপি নেতা ও ৫৬ নং ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলমের কোনো হদিস নেই দু’বছরেও। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগের আঙুল র‌্যাবের বিরুদ্ধেই।
আওয়ামী লীগ বিরোদী দলে থাকাকালে ক্রসফায়ারের কঠোর বিরোধিতা করলেও ক্ষমতায় এসে এর সমর্থন করে। চলতি বছরের ২৩ মার্চ ঝালকাঠির রাজাপুরে তালিকাবুক্ত এক সন্ত্রাসীকে ধরতে গিয়ে র‌্যাবের গুলিতে নিরীহ কলেজ ছাত্র লিমন হোসেন আহত ও পঙ্গু হয়। এ ঘটনায় র‌্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং গঠিত চারটি তদন্ত রিপোর্টে স্ববিরোধী তথ্য পাওয়া যায়। এখনও ইমনের মামলা নিষ্পত্তি হয়নি। পঙ্গু অবস্থায় তাকে র‌্যাবের মামলায় আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে।
ক্রসফায়ারের ঘটনায় উদ্বেগ সৃষ্টি হওয়া এবং কয়েকটি ঘটনায় আদালতে রিট করার পর র‌্যাব সদর দফতর থেকে বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে ক্রসফায়ারকে ‘এনকাউন্টার’ বলে প্রচার চালানো হয়। কিন্তু নাম ভিন্ন হলেও র‌্যাব সদস্যরা নানা কায়দায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- অব্যাহত রাখলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো এর কঠোরভাবে বিরোধিতা করে। ফলে ক্রসফায়ারের পাশাপাশি ২০০৯ সালের দিকে কৌশল বদলে র‌্যাব ও পুলিশ সন্দেহজনক ব্যক্তিকে আটকের পর হাটুতে গুলি করে আহত করার রীতি চালু করে। এ ঘটনায়ও ব্যাপক অভিযোগ ওঠে। অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে যে, সন্দেহজনক ব্যক্তিকে আটক করে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে চোখ বেধে হাটুতে গুলি করে আহত করে অপরাধী বলে প্রচার করা হয়। পর্যবেক্ষক মহল বলছে, ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার, গুপ্তহত্যা, ও বন্দুক যুদ্ধের নাটক সাজিয়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের মতো বিতর্কিত কর্মকা-ে র‌্যাবের প্রশ্নবিদ্ধ ইমেজ আরো ম্লান হয়ে পড়ছে। র‌্যাবের বহু সদস্যও জড়িয়ে পড়েছে নানা অপরাধে। র‌্যাবের দেয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১০ সালেই নানা অপরাধে জড়িত ৭৫৬ জন র‌্যাব সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় বিভিন্ন পদমর্যাদার কমপক্ষে ৩১৪ সদস্যকে গুরুদ-, ৩১০ জন লঘুদ- ও স্ব স্ব বাহিনীতে ফেরত পাঠানো হয়েছে ১৩২ জনকে।মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী ২০০৯, ২০১০ ও চলতি বছরের (২০১১) নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় তিন বছরে (৩৫ মাসে) ৩৫৯ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ে নিহত হন। এর মধ্যে রয়েছেন ২০০৯ সালে ১৫৪ জন, ২০১০ সালে ১২৭ জন ও ২০১১ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে ৭৮ জন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০৪ সালে র‌্যাবের যাত্রা শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত র‌্যাবের বিরুদ্ধে ৭০০ লোককে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। অতীতে এসব হত্যার ব্যাপারে র‌্যাব অথবা সরকার গঠিত বিচার বিভাগীয় কমিটি তদন্ত করেছে। তবে সেসব তদন্তের তথ্য এখনও প্রকাশ করা হয়নি বা গোপনই থেকে গেছে। তবে র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার এম সোহায়েল বলেছেন, র‌্যাব কাউকে আটক করে নিয়ে নিখোজ বা গুম করেছে কেউ এ ধরনের অভিযোগ প্রমাণ করতে পারবে না।
একই সময় পুলিশের বিরুদ্ধেও ছিল বিস্তর অভিযোগ। হরতাল চলাকালে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুকের ওপর পুলিশের নির্মম নির্যাতন, গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে আটক হয়ে বিশিষ্ট আইনজীবী এমইউ আহমেদের মর্মান্তিক মৃত্যু, বিএনপি নেতা ও ডিসিসির সদ্য বিদায়ী মেয়র সাদেক হোসেন খোকাকে পুলিশের সামনে দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাত, দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে আটক করে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে রেখে নির্মম নির্যাতন ও বস্ত্রহীন করার ঘটনা ছিল সবচেয়ে ন্যক্কারজনক ঘটনা। এ ছাড়াও রাজনৈতিক নেতাদের আটকের পর রিমান্ডে নিয়ে নির্মম নির্যাতনের ঘটনাও ছিল আলোচিত।
নরসিংদীর নির্বাচিত জনপ্রিয় মেয়র লোকমান হোসেনকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার অভিযোগ ওঠে খোদ সরকারেরই ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদের প্রতি। নিহত লোকমানের স্বজনদের দাবি, মন্ত্রীর নির্দেশেই তার ভাই সালাহউদ্দিন আহমেদ বাচ্চু ও আওয়ামী লীগ ক্যাডাররা মেয়র লোকমানকে হত্যা করে। এ ঘটনায় মামলার প্রধান আসামি মন্ত্রীর ভাইকে এখন পর্যন্ত পুলিশ গ্রেফতার করেনি। ‘সময়ের অভাবে আসামি ধরা যায়নি’ উল্লেখ করে আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকারের দেয়া বক্তব্যে আত্মীয়স্বজনরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান
শুধু আইনশৃঙ্খলা বিষয় পরিসংখ্যানই নয় ২০১১-র অন্যান্য কিছু পরিসংখ্যানও ছিল উদ্বেগজনক।
এক. স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, (২০.০৯.১১) বাংলাদেশে মাদকসেবীর সংখ্যা ৪৬ লাখ। এরা মাদকের পেছনে খরচ করছে বছরে প্রায় ২৫,০০০ কোটি টাকা।
দুই. পুলিশের দেয়া পরিসংখ্যানে জানা গেছে, ২০১১-র প্রথম নয় মাসে শুধু রাজধানীতেই গাড়ি চুরি বা ছিনতাই হয়েছে প্রায় ১,০০০।
তিন. যোগাযোগ মন্ত্রণালয় জানায়, (২২.০৯.১১) গত দশ বছরে ৪১৭৯১টি রোড অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায় (২২.০৯.১১) ১ জানুয়ারি ২০০১ থেকে ১৫.০৯.২০১১ পর্যন্ত ৩৬,৪৩৯টি রোড অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে।
চার. এসব সূত্রে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ২৭,৫৯৫ এবং আহত ২৫,৪৩৮।

হতাহত ব্যক্তিরা এখন পরিণত হয়েছেন পরিসংখ্যানে। এদের অন্যতম প্রগতিশীল মুভি-মেকার তারেক মাসুদ ও টিভি কর্মকর্তা মিশুক মুনীর। তারেক মাসুদ সেলিবৃটি ছিলেন বলে তার মৃত্যুর পর রোড অ্যাকসিডেন্ট সম্পর্কে মিডিয়া সোচ্চার হয়ে ওঠে। এই সময়ে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মজিবুর রহমান ফকির মন্তব্য করেন :
‘ধর্মমতে মুসলমানদের কোনো অকালমৃত্যু নেই। তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীর তাদের জন্য নির্ধারিত সময়েই মারা গেছে। তাদের জন্য দুঃখ লাগতে পারে। তবে এটাই বাস্তব।’

তার এই মন্তব্য বহুল সমালোচিত হয়। মানুষের মনে পড়ে বিএনপি আমলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরীর একটি দুর্ঘটনা পরবর্তী উক্তি, আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গিয়েছেন।

দুর্ঘটনার পর মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের এসব উক্তিতে আন্তরিকতা ও সমবেদনা নিশ্চয়ই থাকে। তবে তাদের আর্টিকুলেশন ভালো নয় বলে তারা সমালোচিত হন। তারা সমালোচনা অতিক্রম করতে পারেন যদি তারা দেশে জল ও স্থল পথে দুর্ঘটনা কমিয়ে আনার জন্য বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেন। কিন্তু সেটা তারা করেন না। মানুষ ভুলে যায়। পড়ে থাকে মৃত মানুষের স্মৃতি। আহত মানুষের দুঃসহ জীবন।
তারেক মাসুদের গুণী স্ত্রী এখন রোড অ্যাকসিডেন্ট-বিরোধী মুভি নির্মাণে মন দিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে সবাই আশা করবেন তিনি না চাইতেই সরকার তাকে প্রয়োজনীয় অনুদান দেবে।

বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা
২০১১-তে সেলিবৃটি নন এমন ব্যক্তির রোড অ্যাকসিডেন্টের মধ্যে সর্বাধিক আলোচিত ছিল ১১ জুলাইয়ে মিরেরসরাইয়ে একটি বাস দুর্ঘটনায় ৪৫ জন ছাত্রের নিহত হবার সংবাদ। এরা গিয়েছিল সরকারি নির্দেশে ‘বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা গোল্ড কাপ ফুটবল টুর্নামেন্টে’ অংশ নিতে। এই দুর্ঘটনার ফলে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতার নাম নিহতদের আত্মীয়স্বজনদের কাছে চিরবিস্বাদ হয়ে গিয়েছে। সব কিছুতেই বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতার ব্যবহার করা যে উচিত নয় আশা করি সেটা সরকার বুঝবে।

২০১১-তে আরেক সেলিবৃটি নিউজে এসেছেন। জনপ্রিয় লেখক হুমায়ুন আহমেদ ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হয়ে আমেরিকায় চিকিৎসাধীন আছেন। আপামর হিমুভক্তরা তার দ্রুত রোগমুক্তি কামনা করেছেন। তারা আশান্বিত এই কারণে যে, গায়িকা সাবিনা ইয়াসমিনও কথিত দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে সুস্থ হয়ে আবারও হৃদয়গ্রাহী গান শুনিয়েছেন ২০১১-তে।

গুড নিউজ ব্যাড নিউজ
পরিসংখ্যানের মতোই কয়েকটি সংখ্যা ২০১১-তে গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে।
২ : ঢাকা সিটি কর্পরেশনকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে আওয়ামী সরকার। ব্যাড নিউজ।
২০১১-তে দুই দফায় গ্যাসের দাম বেড়েছে। ব্যাড নিউজ।
৪ : ২০১১-তে চার দফায় জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। ব্যাড নিউজ।
৪৩ : বাংলাদেশের ৪৩ শতাংশ শিশুর উচ্চতা বয়সের তুলনায় কম। গার্মেন্টস গার্লদের দেখুন। ভবিষ্যতে আপনার বংশধররাও উচ্চতায় হয়তো ওদেরই মতো কম হবে। ব্যাড নিউজ।
৫৯ : সরকারি চাকরিতে অবসরের বয়স হয়েছে ৫৯। গুড নিউজ।
৬০ : ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ বাংলাদেশে ৬০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় মাত্রার ভূমিকম্প হয় ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১১-তে। এই ভূমিকম্প স্থায়ী ছিল ১ মিনিট ৪০ সেকেন্ড। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল সিকিমের রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৬ দশমিক ৮। পরিবেশবিদরা জানিয়েছেন, ভূমিকম্প ঝুকিতে রয়েছে রাজধানীর ৭২,০০০ ভবন। ভেরি ব্যাড নিউজ।
৬১ : দেশের ৬১টি জেলা পরিষদের প্রশাসক পদে রাজনৈতিক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। নিয়োগ প্রাপ্তদের একজন ছাড়া সকলেই আওয়ামী লীগের দলীয় পদাধিকারী ও স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। ব্যাড নিউজ।
২৬৬ : গতিহীন প্রশাসনে ওএসডি হয়েছে ২৬৬ কর্মকর্তা। ব্যাড নিউজ।
১৪.২৩ কোটি : ২০১১-তে পরিচালিত আদমশুমারিতে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৪.২৩ কোটি! এর মধ্যে অর্ধেকের কোনো অক্ষরজ্ঞান নেই। ভেরি ভেরি ব্যাড নিউজ।

পলিটিক্সে নতুন মুখ নতুন কালচার
রোগাক্রান্ত হয়ে ১৬ মার্চ ২০১১-তে লোকান্তরিত হন দুঃসাহসী বিএনপির সেক্রেটারি জেনারেল খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন। তার পদে ভারপ্রাপ্ত হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অল্প কয়েক মাসেই মির্জা আলমগীর জনমনে ভালো ইমেজ সৃষ্টি করেছেন যদিও তার বিরুদ্ধে এখনো তার দলের মধ্যে মেলা চক্রান্ত চলছে বলে গুজব আছে। প্রেস কনফারেন্সে মির্জা আলমগীর পাংচুয়াল হবার চেষ্টা করছেন (ঢাকার লেজেন্ডারি ট্রাফিক জ্যাম সত্ত্বেও) এবং প্রায়ই লিখিত টেক্সট থেকে বলছেন। তিনি ইকনমিক্সের ছাত্র ও সাবেক শিক্ষক। তার মতো আরো অনেক সৎ, যোগ্য ও শিক্ষিত ব্যক্তির প্রয়োজন বিএনপিতে। অ্যাপ্লাই করুন : ম্যাডাম খালেদা জিয়া, চেয়ারপার্সন, বিএনপি, রোড ৮৬, গুলশান ২ ঢাকা। টিআইএন নাম্বার যদি না থাকে এবং দুর্নীতির দায়ে যদি অভিযুক্ত হয়ে থাকেন তাহলে অ্যাপ্লাই করবেন না।

আওয়ামী লীগ পিছু হটেছে
২০১১-তে অপ্রত্যাশিতভাবে আওয়ামী লীগ সরকার দুটি ক্ষেত্রে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে।
এক. ঢাকার নবাবগঞ্জ ও দোহারের আড়িয়াল বিলে ন্যূনপক্ষে ৫০ হাজার কোটি টাকা খরচে বঙ্গবন্ধু এয়ারপোর্ট ও বঙ্গবন্ধু সিটি নির্মাণের লক্ষ্যে সরকার ১১ ডিসেম্বর ২০১০-এ যে ভূমি অধিগ্রহণের আদেশ দিয়েছিল, জানুয়ারি ২০১১-তে সেখান থেকে পিছু সরে আসতে হয়। ওই এলাকার জনগণ রুখে দাড়ায়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ওই ৫০ হাজার কোটি টাকা কোথায়? তা দিয়ে পদ্মা সেতু বানানো সম্ভব হচ্ছে না কেন?
দুই : দুর্নীতি বিষয়ে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক কঠোর অবস্থান নেয়ায় অভূতপূর্বভাবে পদ্মা সেতুর নির্মাণে অর্থায়ন করা হবে না বলে জানানো হয়। প্রথমে আওয়ামী সরকার ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের এই অবস্থানকে উপেক্ষা করলেও পরবর্তীতে তারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী আবুল হোসেনকে অন্য মন্ত্রণালয়ে বদলি করে। তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি। এখন পর্যন্ত ওয়ার্ল্ড ব্যাংক তাদের অবস্থানে অটল আছে। খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের কথিত দুর্নীতি বিষয়ে তৎপর মিডিয়া এখন হিসাব করে দেখতে পারে এই পদ্মা সেতুর দুর্নীতির মোট পরিমাণ ছিল আর সব কথিত দুর্নীতির যোগফলের বেশি। ক্যালকুলেটর চাইলে আমি পৌঁছে দেব চার্জ (ভ্যাটসহ) দিতে হবে।

ধর্ষণ ও কটূক্তি
অব্যাহত ধর্ষণের সংবাদ ২০১১-তে ছিল অব্যাহত। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময় অভিযোগ করা হয়েছে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ১৯৭১-এ অব্যাহতভাবে ধর্ষণ করেছিলেন ভানু সাহাকে, যিনি ইনডিয়াতে নিখোজ। তার চল্লিশ বছর পরে ২০১১-তে ঘটে যায় ঢাকার ভিকারুননিসা স্কুলে টিচার পরিমল জয়ধর কর্তৃক একাধিকবার জনৈক ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনা।

প্রথমে সরকার তাকে প্রটেকশন দেয়ার জন্য উত্তর বাংলায় ট্রান্সফার করলেও জনমতের চাপে শেষ পর্যন্ত পরিমল হন বরখাস্ত।
অন্য দুটি স্কুলে ২০১১-তে অন্য ধরনের ঘটনা ঘটে। ধানমন্ডি বয়েজ স্কুলে (২.৭.১১) মহানবীর বিরুদ্ধে টিচার মদনমোহন দাসের কটূক্তির ফলে ছাত্ররা স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল করে। এর মাত্র ১২ দিন পরে (১৪.৭.১১) টুঙ্গিপাড়া জিটি হাইস্কুলের টিচার শংকর বিশ্বাস মহানবীর বিরুদ্ধে কটূক্তি করেন। বোঝা যায়, শুধু ১৯৭১-এর ইতিহাস বিকৃতি নয়, ৫৭০ থেকে ৬৩২ খৃষ্টাব্দের ইতিহাস বিকৃতির প্রবণতা সমাজের একটি অংশে দেখা দিয়েছে।
শুধু ইতিহাস বিকৃতিই নয়, দিন বদলের আলোয় অঙ্গীকারবদ্ধ আওয়ামী লীগ নাম বদলে এবং নামকরণে মনোযোগী ছিল ২০১১-তে। ঢাকায় হতশ্রী শেরাটন হোটেলের নাম বদলে হয়েছে রূপসী বাংলা। আর বাংলাদেশ বিমানের নতুন বোয়িং প্লেনের নাম হয়েছে পালকিÑ যে পালকির উদ্বোধনী ফ্লাইটে (ঢাকা-টু-লন্ডন) যাত্রী ছিল খুব কম এবং (লন্ডন-টু-ঢাকা) ফ্লাইট ক্যান্সেল করা হয়।

নতুন আমেরিকান রাষ্ট্রদূত
নতুন ডিজিটাল অন্তর্বাস
তাহলে ২০১১ কি বাংলাদেশের জন্য কোনই ভালো সংবাদ নিয়ে আসেনি?
উত্তর, হ্যা। অন্তত দুটি ভালো সংবাদ আছে।

এক. বাংলাদেশে এসেছেন আমেরিকার নতুন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডাবলিউ মোজেনা। তিনি তার বাড়িতে দেয়া প্রথম রিসেপশনে অতিথিদের একটি গল্পচ্ছলে জানান, তার মা তাকে সবসময় বলতেন, কোনো কিছু চাইলে এবং তার জন্য ঈশ্বরের কাছে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করলে এবং সেই লক্ষ্যে একনিষ্ঠভাবে কাজ করলে, সেই ইচ্ছা পূরণ হয়। মোজেনা এর আগে বাংলাদেশে কাজ করেছিলেন। তখন থেকেই তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসতে চেয়েছিলেন। তার স্বপ্ন এখন পূরণ হয়েছে। মাই মাদার ওয়াজ রাইট। ড্যান মোজেনা এ কথা বলে গল্পের ইতি টানেন।
ওয়েলকাম টু বাংলাদেশ, এক্সিলেন্সি মোজেনা।

দুই. ২০১১-তে অস্ট্রেলিয়ার সিমাভিটা কম্পানি একটি বিশেষ ধরনের ডিজিটাল অন্তর্বাস উদ্ভাবন করেছে। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এটা খুব কাজে দেবে। এ অন্তর্বাস পরা কোনো বয়স্ক লোক মলমূত্র ত্যাগ করলে তথ্যটি তার দেখাশোনার দায়িত্বে নিয়োজিত সেবিকার কাছে লিখিত বার্তা আকারে পৌঁছে যাবে। কম্পানিটি অন্তর্বাসটির নাম দিয়েছে সিমসিস্টেম। তাদের দাবি, এটিই বিশ্বের প্রথম ইলেকট্রনিক অন্তর্বাস। সিমসিস্টেম অন্তর্বাসে একটি ডিসপোজেবল (ব্যবহারের পর ফেলে দিতে হয়) প্যাড আছে। এর সঙ্গে একটি সংবেদনশীল স্টৃপ রয়েছে, যা ওয়্যারলেস নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সেন্ট্রাল কম্পিউটারের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। ফলে অন্তর্বাস পরা কোনো বয়স্ক ব্যক্তি মলমূত্র ত্যাগ করলে তথ্যটি সঙ্গে সঙ্গে তার দায়িত্বে নিয়োজিত সেবিকার কাছে লিখিত বার্তা আকারে পৌছে যাবে। এ সেন্সর স্টৃপটি ডিসপোজেবল প্যাড থেকে বিচ্ছিন্ন করে পুনরায় ব্যবহার করা যাবে।
২০০৮ সালে এ অন্তর্বাসটি প্রথম পরীক্ষামূলক প্রয়োগ এবিসি টেলিভিশনে দেখানো হয়। এটির সফল সংস্করণ এখন অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস জুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

এই খবরটি ডিজিটাল বাংলাদেশ চালুকামী আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য একটি শুভ সংবাদ। কারণ পুরো ২০১১-জুড়ে এই সরকার যে বর্জ্য পদার্থ ছড়িয়ে দিয়েছে সেটা তাদের জন্য সহজতর হতো যদি তারা এই ডিজিটাল অন্তর্বাস ব্যবহার করতেন।
গুডবাই ২০১১।

১১.১২.২০১১