ঢাকা ০৬:৩১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ অগাস্ট ২০২২
সংবাদ শিরোনাম ::
মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে ভাড়ায় পরিচালিত হচ্ছে বেসরকারি হাসপাতাল ন‌ওগাঁর আত্রাইয়ে এক মাদক ব্যবসায়ী সহ আটক চার গাজীপুর মহানগর পুলিশ কর্তৃক ২৪ ঘন্টার উদ্ধার অভিযান নারায়ণগঞ্জের তিতাস গ্যাস খেকো রফিক এর সম্পদের পাহাড় (পর্ব-১) ভাইরাল হওয়া ছাত্রকে বিয়ে করে শিক্ষিকা অবশেষে আত্মহত্যা হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে চা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে অনির্দিষ্টকালের কর্ম বিরতি পাংশায় সড়ক নির্মাণে নিম্ন মানের সামগ্রী ও অনিয়মের অভিযোগ হবিগঞ্জের মাধবপুরে সুমন হত্যাকান্ডের মূল হোতাসহ গ্রেফতার ৩ বাঘায় শুরু হতে যাচ্ছে নদী ড্রেজিং এর কাজ, নতুন স্বপ্নে উজ্জীবিত হচ্ছে চরাঞ্চলের মানুষ হবিগঞ্জের লাখাই সড়কে নিয়ন্ত্রণ হাড়িয়ে চালক নিহত গুরুতর আহত ( আশংকা) ৫

ঢাকার দিনরাত ২৪ ঘন্টা

“সম্পাদকীয়”বোরহান হাওলাদার জসিম।।

লকডাউন চলমান। এক সপ্তাহ শেষে দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়াল। বুধবার অফিসে যাওয়ার পথে অবশ্য মনেই হলো না যে লকডাউন হচ্ছে। আমার এক বন্ধুর গাড়িতে অফিসে গিয়েছিলাম। আমি এখনও পুরোপুরি সেরে উঠিনি। ডাক্তার সিএনজি অটোরিক্সায় আপাতত উঠতে নিষেধ করেছেন। কিন্তু উবার তো লকডাউনে বন্ধ। অগত্যা বন্ধুর শরণাপন্ন হয়েছি। ড্রাইভার বললেন, স্যার প্রথম তিন দিন সুন্দর লকডাউন হয়েছে। আমার গাড়িও একবার আটকেছিল। কিন্তু এরপর কেউ আর লকডাউন মানছে না। গাড়ি আটকাচ্ছে, জরিমানা করছে, কেস দিচ্ছে। তবু মানুষ গাড়ি নিয়ে বের হচ্ছে।

ঠিক তাই। উত্তরা থেকে ইস্কাটনে জনকণ্ঠ ভবনে আসতে মোট নয়টি চেকপোস্ট পেরুলাম। কোথাও আটকাল না। এক জায়গায় পুলিশ ইশারা করেছিলেন হাত উঁচিয়ে, কিন্তু পর মুহূর্তেই সঙ্কেত দিলেন না থামানোর, অর্থাৎ চলে যাওয়ার। ড্রাইভারকে বললাম কেন আমাদের আটকাচ্ছে না? ড্রাইভার বললেন, হতে পারে গাড়িতে সাঁটা বিশেষ স্টিকার দেখে ওরা ধরছেন না। আসলে চেকপোস্টের সামনে এসে অনেক ড্রাইভার ভয় পেয়ে যায়। এটা তাদের চোখেমুখে ফুটে ওঠে। ওদেরই বেশি আটকায়। বললাম, আটকালেও নিশ্চয়ই ওই স্টিকার দেখে আমাদের ছাড়তো। তাছাড়া আমার কাছে তো সাংবাদিকের পরিচয়পত্র আছে। যা হোক, এক জায়গায় শুধু র‌্যাবের টিম দেখলাম। কোথাও সেনাবাহিনীর সদস্যদের দেখলাম না। এতখানি রাস্তা পেরুলাম। অন্তত একস্থানে তো সেনাসদস্যদের দেখা যেত।

এসব দুঃখ কষ্ট মৃত্যু

করোনাকালে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘতর হচ্ছে। গত সপ্তাহে গত ১৬ মাসে প্রথমবারের মতো মৃতের সংখ্যা দুই শ ছাড়াল। ভয় হচ্ছে। আমরা সতর্ক না হলে এই সংখ্যা দৈনিক পাঁচ শ ছাড়িয়ে যেতে পারে। ঘরে থাকা মানে বড় সুরক্ষা, সতর্কতা। কিন্তু ওই পরিবারের কেউ যদি পেশার কারণে প্রতিদিন বাইরে বের হন তাহলে তিনি কি ঘরে ভাইরাস বহন করে আনতে পারেন না? আমাদের বাসায় আমি একা বেরুতাম ঘর থেকে। আর কেউ ঢুকত না, বেরুত না। আমিই প্রথম জ্বরে পড়লাম। তিন দিন না যেতেই টেস্ট করিয়ে পজিটিভ পেলাম। এর দুদিনের মধ্য আমার স্ত্রীর জ্বর এলো। একে একে ছেলে-মেয়ে দুজনেরই। গত ডিসেম্বরের কথা বলছি। আমার শ্বাসকষ্ট হয়নি, তাই হাসপাতালে ভর্তি হওয়া লাগেনি। কিন্তু আমার স্ত্রীর ফুসফুস আক্রান্ত না হলেও একদিন তিনি মরণাপন্ন হয়ে উঠেছিলেন।

গত বছরের করোনা পরিস্থিতি অপেক্ষাকৃত ভাল ছিল বলে মনে হচ্ছে এখন। পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই আমার দুই বন্ধুর করোনা হয়েছিল যথাক্রমে গত বছরের প্রথমার্ধে ও দ্বিতীয়ার্ধে। দুজনেরই নিউমোনিয়া হয়ে গিয়েছিল এবং অক্সিজেনের প্রয়োজন পড়েছিল। কিন্তু তারা করোনামুক্ত হয়েছেন। এসব কথা বলছি পাঠকদের সচেতনতার জন্য। আমার বড় বোন গত মাসটা ছিলেন ছেলের বাসায়। ঘর থেকে বের হতেন না। কিন্তু তিনি কি এড়াতে পারলেন কোভিড? ডায়াবেটিসের পেশেন্ট ছিলেন। যদিও নিয়ন্ত্রণেই ছিল অসুখটা। টিকা নেবেন নেবেন করে নেয়া হয়নি। জ্বর নিয়ে বারডেমে ভর্তি হলেন। পরদিনই আইসিইউতে নেয়া হলো তাকে। তার পরদিন লাইফ সাপোর্টে। করোনায় আমাদের পরিবারে প্রথম মৃত্যু। পুরো একটি দিন মাথায় কাজ করছিল না। পরে নিচের লেখাটি লিখে নিজেকেই সান্ত¦না দিলাম।

মৃত্যুর দিনটি কেমন হবে, কে থাকবেন পাশে, জানি না। পুরো অন্ধকারেই থাকা। জন্মের দিনটিতে কিছুটা আলো এসেছিল, জেনেছি। সামরিক হাসপাতালে আমার জন্মের খবর শুনেই আনন্দিত পিতা তার দুই কন্যাকে নিয়ে রওনা দিলেন। পথিমধ্যে পড়লেন দুর্ঘটনায়। কয়েক সপ্তাহ আগে জননীও পেয়েছিলেন আঘাত, প্রধানত পায়ে, আর সেজন্যই নাকি ভূমিষ্ঠ পুত্রের একটি পা সে-চিহ্ন ও প্রভাব বহন করেছিল বহু মাস। সে যাক, দুই বোনের একজন ব্যথা পেল পায়ে, অন্যজন অন্য কোথাও। কন্যাকে কোলে চড়িয়ে তার আহত পা-টিকে বুদ্ধি করে লুকালেন পিতা তার স্ত্রীর দৃষ্টি থেকে। তবু কি ধরা পড়েননি! সে থাক। চারজনের খুশি একেক রকম। উচ্ছল, উদ্ভাস, উচ্ছ¡াস, উৎসব। একটির সঙ্গে অন্যটির তুলনা চলে না। পরিমাপও অসম্ভব। নিশ্চয়ই সেই সন্তান ভাগ্যবান, যে জন্মের পর পেয়েছে বড় ভাই বা বোন। ভাইদের জন্য বোনেরা চিরকালই মায়া আর টানের ভাণ্ডার নিয়ে থাকেন। শাসনের ভেতরেও পোরা থাকে গভীর মমতা। আঘাতের ভেতর পরম স্নেহ। আমার প্রথম ভুল কে শুধরে দিয়েছেন, প্রথম অপরাধবোধ কারও নজর এড়ায়নি, প্রথম বিপদ থেকে কে উদ্ধার করেছেন? বড় আপাই। এতটা বয়স হলো, তবু পরিবারের বড়দের কাছে আমি সেই ছোটই আছি। মে মাসের ১৯ তারিখে আবার শয্যাবন্দী হলাম। নির্দিষ্ট যুগল হাড় তৃতীয়বারের মতো জখম হলো। তাই শবাসনে শুয়ে থাকা কমপক্ষে তিন সপ্তাহ। খবর পেয়েই দুই দিক থেকে দুই বোন ছুটে এলেন। তখন কি ভেবেছিলাম কিছুকালের মধ্যে হারিয়ে ফেলব একজনকে, মহামারীকালের ভয়ঙ্কর ভাইরাসটির শিকার হবেন তিনি!

বারডেমে ভর্তি হয়েছেন শুনেই ফোন দিলাম বড় আপাকে। ধরলেন না। পরক্ষণেই কলব্যাক করলেন। শান্ত স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর। প্রাণবন্তও। যেমনটা সব সময় শুনে এসেছি। ঘুণাক্ষরেও কি ভেবেছিলাম ওই তিন মিনিট বত্রিশ সেকেন্ড ফোনালাপ এমন স্থিরচিত্র হয়ে থাকবে, ঝুলবে অদৃশ্য পেণ্ডুলামের মতো। যতদিন না আমার জীবনাবসান ঘটছে হয়ত ততদিনই। কেবিন থেকে আইসিইউ, তারপর লাইফ সাপোর্ট। দ্রæত সব দৃশ্যান্তর। এ্যাবসার্ড। আনপ্রেডিক্টেবল। ডিসেম্বরে আমার কোভিড হলো। সবচেয়ে বেশি মিসড কল দেখছি বড় আপারই। প্রতিটি কলের পেছনে যে উদ্বেগ ও ভালবাসা, তা কি আমি ঠিকঠিক অনুভব করতে পারব? এখন চিৎকার করে কাঁদছি, কিন্তু গলা দিয়ে কোন স্বর বের হচ্ছে না কেন?

একধরনের অপরাধবোধেও ভুগছি। অন্যকে কেন দুষব। আমি নিজেই তো দু’দুটো টিকা নিয়েছি স্বার্থপরের মতো। বোনটাকে কেন জোর করে টিকা দেয়ার ব্যবস্থা করলাম না! বার বার শুধু মনে হচ্ছে দু’দুটো টিকা যদি বড় আপাকে দেয়া সম্ভব হতো তাহলে কোভিডে ভুগলেও তাকে আমরা হারাতাম না।

গীতিকার গোলাম মোর্শেদ তার প্রতিক্রিয়ায় ‘বড় আপা’ থিমটিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন- ‘আমার নিজের কোন আপন বড় বোন নেই। তাই বড় বোন বলতে কি বোঝায়, তাদের স্নেহ, মমতা, ভালবাসা-ঠাসানো শাসনের ধুলো মাখা জীবন কেমন, সেটার আমার জানার সুযোগ ছিল না।

মারুফ ভাইয়ের লিখাতে খবরটি পেলাম। তবে উনার লিখাটি এমন নয় যে, একটি দুঃসংবাদের চিঠি কোনা এক অজানা ডাক পিয়ন ঘরে পৌঁছে দিয়েছে। আমার কাছে একেবারে অন্যরকমভাবে ব্যাপারটি মনকে এলোমেলো করেছে।

প্রথম কথায় ফিরে এসে বলছি, আমার মনে হয়েছে আমি আমার এক বড় বোনকে হঠাৎ করে খুঁজে পেয়েছি এবং হঠাৎ করেই কেমন করে যেন হারিয়ে ফেলেছি।

মারুফ ভাইয়ের মতো আমি চিৎকার করে কাঁদছি না ঠিক, কিন্তু কোথায় যেন মনের ভেতর একটা বেদনা চিৎকার করছে । একটা বড় বোনের জন্য।

একজন করোনা রোগীর জবানবন্দি

শনিবারে কথা বলছিলাম পারিবারিক বন্ধুর সঙ্গে। তিনি গৃহিণী। করোনাক্রান্ত হওয়ার ১১তম দিবস চলছিল তার সেদিন। বয়স চল্লিশ হয়নি বলে টিকা দেয়ার সুযোগ পাননি। সম্ভবত তার করোনা হয়েছিল নিকট বান্ধবীর স্বামী করোনাক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর বান্ধবীর পরিবারকে সময় দিতে গিয়ে। এই সামাজিকতা তিনি এড়াতে পারেননি। এড়াতে চানও নাই। এই ভদ্রমহিলা সবার বিপদেই ঝাঁপিয়ে পড়েন। সবার উপকার করার জন্য উদগ্রীব থাকেন। নিজের সুরক্ষার দিকটিও পালন করেন যথাসাধ্য। কিন্তু শতভাগ সুরক্ষা শুধু একটি ঘরে নিজেকে বিচ্ছিন্ন বন্দী করে রাখলেই হয়ত সম্ভব। যা হোক, ধরা যাক তার নাম মনি। স্বামী ব্যবসায়ী। করোনা টেস্ট করানোর জন্য বাসাতে নিজেই প্রাইভেট ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মীকে ডাকেন। জ্বর ২৪ ঘণ্টা না পেরুতেই তিনি সতর্কতামূলকভাবে এই টেস্ট করান। পজিটিভি হওয়ার পর নিজেকে একটি ঘরের ভেতর আটকে ফেলেন। ভাশুর তার ডাক্তার। তার চিকিৎসাই নিতে থাকেন। কিন্তু একপর্যায়ে জ্বর ও সারা শরীরে ব্যথা আর সহ্য করে উঠতে পারছিলেন না। তখনই তার এক ডাক্তার বান্ধবী, যার নিজেরও করোনা হয়েছিল, তিনি ভিন্ন একজন ডাক্তারের কথা বললেন। সেই ডাক্তার দেখালে তিনি নতুন একটা ওষুধ দেন। এক প্যাকেটে ২০ ট্যাবলেট থাকে, দাম চার হাজার টাকা। প্রথম দিন সকালে ৮টি, রাতে ৮টি মোট ১৬টি ট্যাবলেট খেতে হয়েছে। তারপর থেকে প্রতিদিন সকালে ৩ রাতে তিন মোট ছয়টি করে ট্যাবলেট খাচ্ছেন। ডাক্তার ঘুমের ওষুধও দিয়েছেন। রাতে ভালো ঘুম হচ্ছে। দুপুরেও ঘুমোতে পারছেন। ওই ওষুধ খাওয়ার পর থেকে জ্বর আর গায়ে ব্যথা উধাও হয়ে গেছে।

রাজশাহীতে থাকেন মনির এক অধ্যাপিকা বন্ধু। তিনি নিজে থেকে টাকা পাঠিয়েছেন। মনির জন্য ঢাকার একটি বড় হাসপাতালের বেডও ঠিক করেছেন লোক পাঠিয়ে। বলেছেন, মনি যত টাকা লাগে চিকিৎসার যেন কোনো ত্রæটি না হয়। করোনাকে হারাতেই হবে।

মনি তার দুঃখের কথা জানালেন। স্বামী সবচেয়ে আপন মানুষ। কিন্তু স্বামী তার সঙ্গে সহানুভ‚তিশীল আচরণ করেননি। মনির ভাষায় তার স্বামী এমন ব্যবহার করেছেন যেন তার কুষ্ঠ হয়েছে। একবারই স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি রক্ত পরীক্ষা ও এক্সরে করাতে গিয়েছিলেন। আর যাননি। মনির কথা হচ্ছে এই করোনা অত্যন্ত ছোঁয়াচে সেটি কি আমি জানি না। আমি তার সেবা চাইছি না। কিন্তু তার কথায় দূর থেকে দৃষ্টি ও আচরণে মনে হতে হবে যে ইচ্ছে থাকলেও তিনি কিছু করতে অপারগ। এজন্য তার কষ্ট হচ্ছে। স্ত্রীর জন্য তিনিও উদ্বিগ্ন। সংক্রামক রোগ হওয়ায় তিনি যথাযথ কেয়ারিংয়ে অসমর্থ। মনির ভাষায়, আমি বলব সে আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছে। তার যদি করোনা হতো তাহলে আমি কি তাকে সেবা না করে থাকতে পারতাম? কখনোই পারতাম না।

ঠিকই বলেছেন মনি। তিনি বলে নয়, কোন স্ত্রীই কি স্বামীর করোনা হলে তার থেকে দূরে থাকতে পারেন? আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কি তাকে কোন ছাড় দিত? আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব থেকে শুরু করে সবাই স্ত্রীকে কথা শোনাতে ছাড়ত না। যদিও আমি আমতা আমতা করে মনিকে বলার চেষ্টা করলাম যে আপনার স্বামী সতর্ক ও সচেতন। তিনি অসুস্থ হলে সংসারের কি হবে ভেবে দেখেছেন? আপনার দুই কন্যাও ঝুঁকিতে পড়ে যাবে।

এই এগারো দিনে মনির দুই কন্যার জন্মদিন গেল। বড়টি কিশোরী, সে বুঝবে। কিন্তু ছোটটি তো আশা করে থাকবে তার জন্মদিন পালিত হবে, মা কেক আনাবেন। মনি বললেন, ছোট মেয়ের জন্মদিনের জন্য সব ব্যবস্থাই হয়েছে। মাঝে ডাইনিং স্পেস রেখে এপারে মা ডবল মাস্ক পরে মাথা ঢেকে দরজা খুলে দাঁড়িয়েছেন। ওইপারে ড্রই্ংরুমের দরজায় দাঁড়িয়েছে দুই কন্যা। মেয়েদের দিকে মনি উড়ন্ত চুম্বন ছুড়ে দিয়েছেন, ইশারায় আলিঙ্গন করেছেন। কথা বলেছেন। তাড়াতাড়ি আবার ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিযেছেন।

আহারে মায়ের মন।

ঢাকা মেডিক্যালের মর্গ এবং ‘বস্তা বস্তা কয়লা’

অনলাইনে তৌহিদুল ইসলামের রিপোর্ট পড়তে গিয়ে দেখি চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে, আর পড়তে পারছি না। সেই লেখা থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছি- ‘ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মর্গের পাশে স্বজনরা শুধু লাশের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন। কেউ কেউ প্রিয়জন হারানোর বেদনায় ঢুকরে কান্না করছেন। আবার কারও সারা দিনের ধকল, ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় কান্না শুকিয়ে গেছে। মর্গের পাশে ভিড়ের মধ্যে মোবাইলে ফোন এল রাহিমা বেগমের। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফুঁপিয়ে কাঁদলেন তিনি। মোবাইলের অপর প্রান্তের স্বজনের প্রশ্নের জবাবে রাহিমা বেগম বললেন, ‘লাশ কী, বস্তায় কইরা সব কয়লা আনছে। কারও লাশই নাকি চেনার উপায় নেই।’

২০১২ সালে ঢাকার আশুলিয়ায় তাজরীন ফ্যাশনসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শতাধিক মানুষের মৃত্যুর পর রূপগঞ্জের কারখানার অগ্নিকাণ্ড এক বিরাট ক্ষতি, প্রাথমিক হিসাবে ৫২ জন মারা গেছেন। ৭০ জন নিখোঁজ। কারখানার মালিকদের আইন মেনে চলতে বাধ্য করা হলে এমন মর্মান্তিক ঘটনা এড়ানো সম্ভব হবে। তাই সরকারকে নজরদারি বাড়াতে হবে, যাতে কোন কারখানা মালিক আইন ফাঁকি দিয়ে শ্রমিকদের এভাবে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে না পারে। এই অগ্নিকাণ্ড দেশের প্রতিটি কারখানা কর্তৃপক্ষের জন্য সতর্কতা সঙ্কেত। তারা সতর্ক হয়ে আইনসম্মত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করলে খেটে খাওয়া মানুষের জীবন বাঁচবে। নতুবা এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে তারা কিছুতেই মানব হত্যার দায় এড়াতে পারবেন না।

সামাজিক মাধ্যমে প্রচুর লেখালেখি হচ্ছে। জিয়া হাসানের অভিমত কিছুতেই মন থেকে সরাতে পারছি না। তার মন্তব্য ‘ফায়ার এক্সিট যদি নাও থাকে, বিল্ডিংয়ের প্রধান সিঁড়ি যদি খোলা থাকে, একটা বিল্ডিংয়ের চতুর্থ তলায় ৫০ জন শ্রমিকের মৃত্যু প্রায় অসম্ভব। শ্রমিকরা দেখতে না পেলেও অথবা তাপ বেশি হলো ধোঁয়ার মধ্যে এক মিনিটের নিচে নেমে যাবে। এই ধরনের একটা ছোট বিল্ডিংয়ে, তখনই একটি ফ্লোরে ৫০ জনের মৃত্যু সম্ভব যখন, ভেতর থেকে তালা দিয়ে লক করা থাকবে। অথবা প্রধান গেটের সামনে আগুন লাগার মতো জিনিসপত্র পড়ে থাকবে, যে ওই পথটা আবদ্ধ হয়ে যাবে। এমনকি সে ক্ষেত্রে একটি ফ্লোরে আটকে পড়া শ্রমিকদের ছাদে উঠে গিয়ে সেখান থেকে ঝাঁপ দেয়ার কথা। সজীব গ্রæপের বিরুদ্ধে অধিকাংশ মিডিয়া আসল সত্য বের হতে দেবে না। আগামীতে ইনভেস্টিগেশনে কি বের হবে সেটা জানা কথা। কিন্তু, এখন পর্যন্ত শ্রমিকদের যে বক্তব্য জানা যাচ্ছে, এবং এ ধরনের বিল্ডিংয়ের এডমিনিস্ট্রেশনের পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে বলছি- এটা একটা পরিষ্কার হত্যাকাণ্ড।

হয় গেটলক ছিল। অথবা ফায়ার এক্সিট ছাড়া বিল্ডিংয়ে প্রধান গেটের ওপর এই দাহ্য বস্তু ছিল। দুইটাই মালিকের অবহেলাজনিত স্ট্রাকচারাল হত্যাকাণ্ড।

বন্ধু কারুতিতাস তাৎক্ষণিকভাবে ছবি আঁকলেন ‘সজীব কয়লা কারখানা’। জ্বলন্ত কারখানার প্রেক্ষাপটে কয়লা হয়ে যাওয়া শ্রমিক। লাল ও কালোর সমন্বয়ে মর্মস্পর্শী এক চিত্রকর্ম। অবাক কাণ্ড! আমাদের প্রশাসনের সংস্কৃতি যে বদলে গেছে তার প্রমাণ অল্প সময়ের মধ্যেই পেলাম। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাসেম ফুডসের কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ৫২ জনের মৃত্যুর ঘটনায় গ্রেফতার গ্রæপের চেয়ারম্যান, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাসহ (সিইও) ৮ জনকে চার দিনের রিমান্ডে পেয়েছে পুলিশ। তবে পুরো সিস্টেমটার রিভিউ দরকার। যারা কারখানাগুলোর অডিটে দুর্নীতি করে সেসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদেরও আইনের আওতায় আনা হলে আরও ভাল হবে। কারখানা পরিদর্শনকারীরা মোটা অঙ্কের টাকা পেযয়ে থাকেন এসব শিল্পমালিক থেকে, এমন একটা অভিযোগ কি আমরা উড়িয়ে দিতে পারব?

১৩ জুলাই ২০২১

আরো খবর.......
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে ভাড়ায় পরিচালিত হচ্ছে বেসরকারি হাসপাতাল

ঢাকার দিনরাত ২৪ ঘন্টা

আপডেট টাইম : ০২:৫৭:২০ অপরাহ্ণ, মঙ্গলবার, ১৩ জুলাই ২০২১

“সম্পাদকীয়”বোরহান হাওলাদার জসিম।।

লকডাউন চলমান। এক সপ্তাহ শেষে দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়াল। বুধবার অফিসে যাওয়ার পথে অবশ্য মনেই হলো না যে লকডাউন হচ্ছে। আমার এক বন্ধুর গাড়িতে অফিসে গিয়েছিলাম। আমি এখনও পুরোপুরি সেরে উঠিনি। ডাক্তার সিএনজি অটোরিক্সায় আপাতত উঠতে নিষেধ করেছেন। কিন্তু উবার তো লকডাউনে বন্ধ। অগত্যা বন্ধুর শরণাপন্ন হয়েছি। ড্রাইভার বললেন, স্যার প্রথম তিন দিন সুন্দর লকডাউন হয়েছে। আমার গাড়িও একবার আটকেছিল। কিন্তু এরপর কেউ আর লকডাউন মানছে না। গাড়ি আটকাচ্ছে, জরিমানা করছে, কেস দিচ্ছে। তবু মানুষ গাড়ি নিয়ে বের হচ্ছে।

ঠিক তাই। উত্তরা থেকে ইস্কাটনে জনকণ্ঠ ভবনে আসতে মোট নয়টি চেকপোস্ট পেরুলাম। কোথাও আটকাল না। এক জায়গায় পুলিশ ইশারা করেছিলেন হাত উঁচিয়ে, কিন্তু পর মুহূর্তেই সঙ্কেত দিলেন না থামানোর, অর্থাৎ চলে যাওয়ার। ড্রাইভারকে বললাম কেন আমাদের আটকাচ্ছে না? ড্রাইভার বললেন, হতে পারে গাড়িতে সাঁটা বিশেষ স্টিকার দেখে ওরা ধরছেন না। আসলে চেকপোস্টের সামনে এসে অনেক ড্রাইভার ভয় পেয়ে যায়। এটা তাদের চোখেমুখে ফুটে ওঠে। ওদেরই বেশি আটকায়। বললাম, আটকালেও নিশ্চয়ই ওই স্টিকার দেখে আমাদের ছাড়তো। তাছাড়া আমার কাছে তো সাংবাদিকের পরিচয়পত্র আছে। যা হোক, এক জায়গায় শুধু র‌্যাবের টিম দেখলাম। কোথাও সেনাবাহিনীর সদস্যদের দেখলাম না। এতখানি রাস্তা পেরুলাম। অন্তত একস্থানে তো সেনাসদস্যদের দেখা যেত।

এসব দুঃখ কষ্ট মৃত্যু

করোনাকালে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘতর হচ্ছে। গত সপ্তাহে গত ১৬ মাসে প্রথমবারের মতো মৃতের সংখ্যা দুই শ ছাড়াল। ভয় হচ্ছে। আমরা সতর্ক না হলে এই সংখ্যা দৈনিক পাঁচ শ ছাড়িয়ে যেতে পারে। ঘরে থাকা মানে বড় সুরক্ষা, সতর্কতা। কিন্তু ওই পরিবারের কেউ যদি পেশার কারণে প্রতিদিন বাইরে বের হন তাহলে তিনি কি ঘরে ভাইরাস বহন করে আনতে পারেন না? আমাদের বাসায় আমি একা বেরুতাম ঘর থেকে। আর কেউ ঢুকত না, বেরুত না। আমিই প্রথম জ্বরে পড়লাম। তিন দিন না যেতেই টেস্ট করিয়ে পজিটিভ পেলাম। এর দুদিনের মধ্য আমার স্ত্রীর জ্বর এলো। একে একে ছেলে-মেয়ে দুজনেরই। গত ডিসেম্বরের কথা বলছি। আমার শ্বাসকষ্ট হয়নি, তাই হাসপাতালে ভর্তি হওয়া লাগেনি। কিন্তু আমার স্ত্রীর ফুসফুস আক্রান্ত না হলেও একদিন তিনি মরণাপন্ন হয়ে উঠেছিলেন।

গত বছরের করোনা পরিস্থিতি অপেক্ষাকৃত ভাল ছিল বলে মনে হচ্ছে এখন। পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই আমার দুই বন্ধুর করোনা হয়েছিল যথাক্রমে গত বছরের প্রথমার্ধে ও দ্বিতীয়ার্ধে। দুজনেরই নিউমোনিয়া হয়ে গিয়েছিল এবং অক্সিজেনের প্রয়োজন পড়েছিল। কিন্তু তারা করোনামুক্ত হয়েছেন। এসব কথা বলছি পাঠকদের সচেতনতার জন্য। আমার বড় বোন গত মাসটা ছিলেন ছেলের বাসায়। ঘর থেকে বের হতেন না। কিন্তু তিনি কি এড়াতে পারলেন কোভিড? ডায়াবেটিসের পেশেন্ট ছিলেন। যদিও নিয়ন্ত্রণেই ছিল অসুখটা। টিকা নেবেন নেবেন করে নেয়া হয়নি। জ্বর নিয়ে বারডেমে ভর্তি হলেন। পরদিনই আইসিইউতে নেয়া হলো তাকে। তার পরদিন লাইফ সাপোর্টে। করোনায় আমাদের পরিবারে প্রথম মৃত্যু। পুরো একটি দিন মাথায় কাজ করছিল না। পরে নিচের লেখাটি লিখে নিজেকেই সান্ত¦না দিলাম।

মৃত্যুর দিনটি কেমন হবে, কে থাকবেন পাশে, জানি না। পুরো অন্ধকারেই থাকা। জন্মের দিনটিতে কিছুটা আলো এসেছিল, জেনেছি। সামরিক হাসপাতালে আমার জন্মের খবর শুনেই আনন্দিত পিতা তার দুই কন্যাকে নিয়ে রওনা দিলেন। পথিমধ্যে পড়লেন দুর্ঘটনায়। কয়েক সপ্তাহ আগে জননীও পেয়েছিলেন আঘাত, প্রধানত পায়ে, আর সেজন্যই নাকি ভূমিষ্ঠ পুত্রের একটি পা সে-চিহ্ন ও প্রভাব বহন করেছিল বহু মাস। সে যাক, দুই বোনের একজন ব্যথা পেল পায়ে, অন্যজন অন্য কোথাও। কন্যাকে কোলে চড়িয়ে তার আহত পা-টিকে বুদ্ধি করে লুকালেন পিতা তার স্ত্রীর দৃষ্টি থেকে। তবু কি ধরা পড়েননি! সে থাক। চারজনের খুশি একেক রকম। উচ্ছল, উদ্ভাস, উচ্ছ¡াস, উৎসব। একটির সঙ্গে অন্যটির তুলনা চলে না। পরিমাপও অসম্ভব। নিশ্চয়ই সেই সন্তান ভাগ্যবান, যে জন্মের পর পেয়েছে বড় ভাই বা বোন। ভাইদের জন্য বোনেরা চিরকালই মায়া আর টানের ভাণ্ডার নিয়ে থাকেন। শাসনের ভেতরেও পোরা থাকে গভীর মমতা। আঘাতের ভেতর পরম স্নেহ। আমার প্রথম ভুল কে শুধরে দিয়েছেন, প্রথম অপরাধবোধ কারও নজর এড়ায়নি, প্রথম বিপদ থেকে কে উদ্ধার করেছেন? বড় আপাই। এতটা বয়স হলো, তবু পরিবারের বড়দের কাছে আমি সেই ছোটই আছি। মে মাসের ১৯ তারিখে আবার শয্যাবন্দী হলাম। নির্দিষ্ট যুগল হাড় তৃতীয়বারের মতো জখম হলো। তাই শবাসনে শুয়ে থাকা কমপক্ষে তিন সপ্তাহ। খবর পেয়েই দুই দিক থেকে দুই বোন ছুটে এলেন। তখন কি ভেবেছিলাম কিছুকালের মধ্যে হারিয়ে ফেলব একজনকে, মহামারীকালের ভয়ঙ্কর ভাইরাসটির শিকার হবেন তিনি!

বারডেমে ভর্তি হয়েছেন শুনেই ফোন দিলাম বড় আপাকে। ধরলেন না। পরক্ষণেই কলব্যাক করলেন। শান্ত স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর। প্রাণবন্তও। যেমনটা সব সময় শুনে এসেছি। ঘুণাক্ষরেও কি ভেবেছিলাম ওই তিন মিনিট বত্রিশ সেকেন্ড ফোনালাপ এমন স্থিরচিত্র হয়ে থাকবে, ঝুলবে অদৃশ্য পেণ্ডুলামের মতো। যতদিন না আমার জীবনাবসান ঘটছে হয়ত ততদিনই। কেবিন থেকে আইসিইউ, তারপর লাইফ সাপোর্ট। দ্রæত সব দৃশ্যান্তর। এ্যাবসার্ড। আনপ্রেডিক্টেবল। ডিসেম্বরে আমার কোভিড হলো। সবচেয়ে বেশি মিসড কল দেখছি বড় আপারই। প্রতিটি কলের পেছনে যে উদ্বেগ ও ভালবাসা, তা কি আমি ঠিকঠিক অনুভব করতে পারব? এখন চিৎকার করে কাঁদছি, কিন্তু গলা দিয়ে কোন স্বর বের হচ্ছে না কেন?

একধরনের অপরাধবোধেও ভুগছি। অন্যকে কেন দুষব। আমি নিজেই তো দু’দুটো টিকা নিয়েছি স্বার্থপরের মতো। বোনটাকে কেন জোর করে টিকা দেয়ার ব্যবস্থা করলাম না! বার বার শুধু মনে হচ্ছে দু’দুটো টিকা যদি বড় আপাকে দেয়া সম্ভব হতো তাহলে কোভিডে ভুগলেও তাকে আমরা হারাতাম না।

গীতিকার গোলাম মোর্শেদ তার প্রতিক্রিয়ায় ‘বড় আপা’ থিমটিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন- ‘আমার নিজের কোন আপন বড় বোন নেই। তাই বড় বোন বলতে কি বোঝায়, তাদের স্নেহ, মমতা, ভালবাসা-ঠাসানো শাসনের ধুলো মাখা জীবন কেমন, সেটার আমার জানার সুযোগ ছিল না।

মারুফ ভাইয়ের লিখাতে খবরটি পেলাম। তবে উনার লিখাটি এমন নয় যে, একটি দুঃসংবাদের চিঠি কোনা এক অজানা ডাক পিয়ন ঘরে পৌঁছে দিয়েছে। আমার কাছে একেবারে অন্যরকমভাবে ব্যাপারটি মনকে এলোমেলো করেছে।

প্রথম কথায় ফিরে এসে বলছি, আমার মনে হয়েছে আমি আমার এক বড় বোনকে হঠাৎ করে খুঁজে পেয়েছি এবং হঠাৎ করেই কেমন করে যেন হারিয়ে ফেলেছি।

মারুফ ভাইয়ের মতো আমি চিৎকার করে কাঁদছি না ঠিক, কিন্তু কোথায় যেন মনের ভেতর একটা বেদনা চিৎকার করছে । একটা বড় বোনের জন্য।

একজন করোনা রোগীর জবানবন্দি

শনিবারে কথা বলছিলাম পারিবারিক বন্ধুর সঙ্গে। তিনি গৃহিণী। করোনাক্রান্ত হওয়ার ১১তম দিবস চলছিল তার সেদিন। বয়স চল্লিশ হয়নি বলে টিকা দেয়ার সুযোগ পাননি। সম্ভবত তার করোনা হয়েছিল নিকট বান্ধবীর স্বামী করোনাক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর বান্ধবীর পরিবারকে সময় দিতে গিয়ে। এই সামাজিকতা তিনি এড়াতে পারেননি। এড়াতে চানও নাই। এই ভদ্রমহিলা সবার বিপদেই ঝাঁপিয়ে পড়েন। সবার উপকার করার জন্য উদগ্রীব থাকেন। নিজের সুরক্ষার দিকটিও পালন করেন যথাসাধ্য। কিন্তু শতভাগ সুরক্ষা শুধু একটি ঘরে নিজেকে বিচ্ছিন্ন বন্দী করে রাখলেই হয়ত সম্ভব। যা হোক, ধরা যাক তার নাম মনি। স্বামী ব্যবসায়ী। করোনা টেস্ট করানোর জন্য বাসাতে নিজেই প্রাইভেট ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মীকে ডাকেন। জ্বর ২৪ ঘণ্টা না পেরুতেই তিনি সতর্কতামূলকভাবে এই টেস্ট করান। পজিটিভি হওয়ার পর নিজেকে একটি ঘরের ভেতর আটকে ফেলেন। ভাশুর তার ডাক্তার। তার চিকিৎসাই নিতে থাকেন। কিন্তু একপর্যায়ে জ্বর ও সারা শরীরে ব্যথা আর সহ্য করে উঠতে পারছিলেন না। তখনই তার এক ডাক্তার বান্ধবী, যার নিজেরও করোনা হয়েছিল, তিনি ভিন্ন একজন ডাক্তারের কথা বললেন। সেই ডাক্তার দেখালে তিনি নতুন একটা ওষুধ দেন। এক প্যাকেটে ২০ ট্যাবলেট থাকে, দাম চার হাজার টাকা। প্রথম দিন সকালে ৮টি, রাতে ৮টি মোট ১৬টি ট্যাবলেট খেতে হয়েছে। তারপর থেকে প্রতিদিন সকালে ৩ রাতে তিন মোট ছয়টি করে ট্যাবলেট খাচ্ছেন। ডাক্তার ঘুমের ওষুধও দিয়েছেন। রাতে ভালো ঘুম হচ্ছে। দুপুরেও ঘুমোতে পারছেন। ওই ওষুধ খাওয়ার পর থেকে জ্বর আর গায়ে ব্যথা উধাও হয়ে গেছে।

রাজশাহীতে থাকেন মনির এক অধ্যাপিকা বন্ধু। তিনি নিজে থেকে টাকা পাঠিয়েছেন। মনির জন্য ঢাকার একটি বড় হাসপাতালের বেডও ঠিক করেছেন লোক পাঠিয়ে। বলেছেন, মনি যত টাকা লাগে চিকিৎসার যেন কোনো ত্রæটি না হয়। করোনাকে হারাতেই হবে।

মনি তার দুঃখের কথা জানালেন। স্বামী সবচেয়ে আপন মানুষ। কিন্তু স্বামী তার সঙ্গে সহানুভ‚তিশীল আচরণ করেননি। মনির ভাষায় তার স্বামী এমন ব্যবহার করেছেন যেন তার কুষ্ঠ হয়েছে। একবারই স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি রক্ত পরীক্ষা ও এক্সরে করাতে গিয়েছিলেন। আর যাননি। মনির কথা হচ্ছে এই করোনা অত্যন্ত ছোঁয়াচে সেটি কি আমি জানি না। আমি তার সেবা চাইছি না। কিন্তু তার কথায় দূর থেকে দৃষ্টি ও আচরণে মনে হতে হবে যে ইচ্ছে থাকলেও তিনি কিছু করতে অপারগ। এজন্য তার কষ্ট হচ্ছে। স্ত্রীর জন্য তিনিও উদ্বিগ্ন। সংক্রামক রোগ হওয়ায় তিনি যথাযথ কেয়ারিংয়ে অসমর্থ। মনির ভাষায়, আমি বলব সে আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছে। তার যদি করোনা হতো তাহলে আমি কি তাকে সেবা না করে থাকতে পারতাম? কখনোই পারতাম না।

ঠিকই বলেছেন মনি। তিনি বলে নয়, কোন স্ত্রীই কি স্বামীর করোনা হলে তার থেকে দূরে থাকতে পারেন? আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কি তাকে কোন ছাড় দিত? আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব থেকে শুরু করে সবাই স্ত্রীকে কথা শোনাতে ছাড়ত না। যদিও আমি আমতা আমতা করে মনিকে বলার চেষ্টা করলাম যে আপনার স্বামী সতর্ক ও সচেতন। তিনি অসুস্থ হলে সংসারের কি হবে ভেবে দেখেছেন? আপনার দুই কন্যাও ঝুঁকিতে পড়ে যাবে।

এই এগারো দিনে মনির দুই কন্যার জন্মদিন গেল। বড়টি কিশোরী, সে বুঝবে। কিন্তু ছোটটি তো আশা করে থাকবে তার জন্মদিন পালিত হবে, মা কেক আনাবেন। মনি বললেন, ছোট মেয়ের জন্মদিনের জন্য সব ব্যবস্থাই হয়েছে। মাঝে ডাইনিং স্পেস রেখে এপারে মা ডবল মাস্ক পরে মাথা ঢেকে দরজা খুলে দাঁড়িয়েছেন। ওইপারে ড্রই্ংরুমের দরজায় দাঁড়িয়েছে দুই কন্যা। মেয়েদের দিকে মনি উড়ন্ত চুম্বন ছুড়ে দিয়েছেন, ইশারায় আলিঙ্গন করেছেন। কথা বলেছেন। তাড়াতাড়ি আবার ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিযেছেন।

আহারে মায়ের মন।

ঢাকা মেডিক্যালের মর্গ এবং ‘বস্তা বস্তা কয়লা’

অনলাইনে তৌহিদুল ইসলামের রিপোর্ট পড়তে গিয়ে দেখি চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে, আর পড়তে পারছি না। সেই লেখা থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছি- ‘ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মর্গের পাশে স্বজনরা শুধু লাশের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন। কেউ কেউ প্রিয়জন হারানোর বেদনায় ঢুকরে কান্না করছেন। আবার কারও সারা দিনের ধকল, ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় কান্না শুকিয়ে গেছে। মর্গের পাশে ভিড়ের মধ্যে মোবাইলে ফোন এল রাহিমা বেগমের। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফুঁপিয়ে কাঁদলেন তিনি। মোবাইলের অপর প্রান্তের স্বজনের প্রশ্নের জবাবে রাহিমা বেগম বললেন, ‘লাশ কী, বস্তায় কইরা সব কয়লা আনছে। কারও লাশই নাকি চেনার উপায় নেই।’

২০১২ সালে ঢাকার আশুলিয়ায় তাজরীন ফ্যাশনসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শতাধিক মানুষের মৃত্যুর পর রূপগঞ্জের কারখানার অগ্নিকাণ্ড এক বিরাট ক্ষতি, প্রাথমিক হিসাবে ৫২ জন মারা গেছেন। ৭০ জন নিখোঁজ। কারখানার মালিকদের আইন মেনে চলতে বাধ্য করা হলে এমন মর্মান্তিক ঘটনা এড়ানো সম্ভব হবে। তাই সরকারকে নজরদারি বাড়াতে হবে, যাতে কোন কারখানা মালিক আইন ফাঁকি দিয়ে শ্রমিকদের এভাবে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে না পারে। এই অগ্নিকাণ্ড দেশের প্রতিটি কারখানা কর্তৃপক্ষের জন্য সতর্কতা সঙ্কেত। তারা সতর্ক হয়ে আইনসম্মত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করলে খেটে খাওয়া মানুষের জীবন বাঁচবে। নতুবা এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে তারা কিছুতেই মানব হত্যার দায় এড়াতে পারবেন না।

সামাজিক মাধ্যমে প্রচুর লেখালেখি হচ্ছে। জিয়া হাসানের অভিমত কিছুতেই মন থেকে সরাতে পারছি না। তার মন্তব্য ‘ফায়ার এক্সিট যদি নাও থাকে, বিল্ডিংয়ের প্রধান সিঁড়ি যদি খোলা থাকে, একটা বিল্ডিংয়ের চতুর্থ তলায় ৫০ জন শ্রমিকের মৃত্যু প্রায় অসম্ভব। শ্রমিকরা দেখতে না পেলেও অথবা তাপ বেশি হলো ধোঁয়ার মধ্যে এক মিনিটের নিচে নেমে যাবে। এই ধরনের একটা ছোট বিল্ডিংয়ে, তখনই একটি ফ্লোরে ৫০ জনের মৃত্যু সম্ভব যখন, ভেতর থেকে তালা দিয়ে লক করা থাকবে। অথবা প্রধান গেটের সামনে আগুন লাগার মতো জিনিসপত্র পড়ে থাকবে, যে ওই পথটা আবদ্ধ হয়ে যাবে। এমনকি সে ক্ষেত্রে একটি ফ্লোরে আটকে পড়া শ্রমিকদের ছাদে উঠে গিয়ে সেখান থেকে ঝাঁপ দেয়ার কথা। সজীব গ্রæপের বিরুদ্ধে অধিকাংশ মিডিয়া আসল সত্য বের হতে দেবে না। আগামীতে ইনভেস্টিগেশনে কি বের হবে সেটা জানা কথা। কিন্তু, এখন পর্যন্ত শ্রমিকদের যে বক্তব্য জানা যাচ্ছে, এবং এ ধরনের বিল্ডিংয়ের এডমিনিস্ট্রেশনের পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে বলছি- এটা একটা পরিষ্কার হত্যাকাণ্ড।

হয় গেটলক ছিল। অথবা ফায়ার এক্সিট ছাড়া বিল্ডিংয়ে প্রধান গেটের ওপর এই দাহ্য বস্তু ছিল। দুইটাই মালিকের অবহেলাজনিত স্ট্রাকচারাল হত্যাকাণ্ড।

বন্ধু কারুতিতাস তাৎক্ষণিকভাবে ছবি আঁকলেন ‘সজীব কয়লা কারখানা’। জ্বলন্ত কারখানার প্রেক্ষাপটে কয়লা হয়ে যাওয়া শ্রমিক। লাল ও কালোর সমন্বয়ে মর্মস্পর্শী এক চিত্রকর্ম। অবাক কাণ্ড! আমাদের প্রশাসনের সংস্কৃতি যে বদলে গেছে তার প্রমাণ অল্প সময়ের মধ্যেই পেলাম। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাসেম ফুডসের কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ৫২ জনের মৃত্যুর ঘটনায় গ্রেফতার গ্রæপের চেয়ারম্যান, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাসহ (সিইও) ৮ জনকে চার দিনের রিমান্ডে পেয়েছে পুলিশ। তবে পুরো সিস্টেমটার রিভিউ দরকার। যারা কারখানাগুলোর অডিটে দুর্নীতি করে সেসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদেরও আইনের আওতায় আনা হলে আরও ভাল হবে। কারখানা পরিদর্শনকারীরা মোটা অঙ্কের টাকা পেযয়ে থাকেন এসব শিল্পমালিক থেকে, এমন একটা অভিযোগ কি আমরা উড়িয়ে দিতে পারব?

১৩ জুলাই ২০২১