কারওয়ান বাজারে অব্যবস্থাপনা, নেপথ্যে চাঁদাবাজি
মালপত্র ও যানবাহন দিয়ে অধিকাংশ সময় এভাবেই কারওয়ান বাজারের মূল সড়ক দখল করে রাখা হয়। ছবি: আমার দেশ
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা কারওয়ান বাজারের ফুটপাতের পুরোটাই দখল হয়ে আছে। সড়কেও রাতদিন বসে ভ্রাম্যমাণ দোকান, উন্মুক্ত ড্রেন থেকে ছড়ায় দুর্গন্ধ, যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে বর্জ্য, কাদাপানিতে ডুবে থাকে রাস্তা এবং পার্কিং থাকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গাড়ির দখলে। শীতে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক থাকলেও বর্ষায় আবর্জনা, জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়। এখানে চলে না সিটি করপোরেশন বা প্রশাসনের আইন। নানা নামে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় কোটি টাকার বেশি চাঁদা তোলা হয় এখান থেকে। চাঁদাবাজরাই নির্ধারণ করেন কীভাবে চলবে এই বাণিজ্যিক এলাকা। ফলে এখানে কোনো উন্নয়নকাজ করতে পারছে না কর্তৃপক্ষ।
রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি এই এলাকায় গড়ে উঠেছে বহুমাত্রিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম। ঢাকার সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার হিসেবে পরিচিত এই এলাকা। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠানের বহুতল ভবনও রয়েছে এখানে।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১ ও ২ নম্বর মার্কেট, কিচেন মার্কেট, সিটি করপোরেশন আড়ৎ ভবন, ডিআইটি মার্কেট, কাব্যকস সুপার মার্কেট, উত্তর কারওয়ান বাজার (ফলের আড়ৎ), পূর্ব তেজতুরী বাজার, হাসিনা মার্কেটসহ প্রায় ১০ থেকে ১২টি মার্কেট ও আড়ৎ রয়েছে কারওয়ান বাজারজুড়ে। এসব মার্কেট ও আড়তের প্রত্যেকটির চারপাশের ফুটপাত ও সড়কের ওপর রয়েছে দোকানপাট। ফুটপাত ছাড়াও কোথাও কোথাও পুরো সড়কজুড়ে অস্থায়ী অবৈধ মার্কেট রয়েছে যা দেখে বোঝার উপায় নেই, এখানে একটি সড়ক রয়েছে। পেট্রোবাংলা থেকে শুরু করে প্রত্যেকটি অলি-গলির মধ্যে রয়েছে অবৈধ গাড়ি পার্কিং। সম্প্রতি প্রধান সড়কের মধ্যে রেখে মাটি, জ্বালানি কাঠের ব্যবসাও শুরু হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে বিমানবাহী রণতরি পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রমধ্যপ্রাচ্যে বিমানবাহী রণতরি পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
আরো দেখা যায়, কারওয়ান বাজারের রাস্তার অবস্থা প্রায়শই বেহাল থাকে। এগুলো সময়মতো সংস্কার করা হয় না। ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়েন ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষ ও কর্মজীবীরা।
অবৈধ পার্কিং এই এলাকার অন্যতম সমস্যা। সরেজমিন দেখা যায়, বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি ভবন ঘিরে রাস্তার দুই পাশে গড়ে উঠেছে অবৈধ পার্কিং। ব্যক্তিগত ও বেসরকারির পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠানের গাড়িও আইন অমান্য করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখা হয় কারওয়ান বাজারের চারপাশের সড়কগুলোয়। ব্যস্ততম সড়কের দুই পাশে দিনভর অসংখ্য পার্কিংয়ের কারণে গাড়ি চলাচলের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয়। পথচারীরা সড়ক দিয়ে চলাচল করতে বাধ্য হন। আর অলি-গলি থেকে শুরু করে প্রধান সড়কও হয়ে উঠেছে গাড়ি চালকদের প্রশ্রাব-পায়খানার খোলা টয়লেট। যা তীব্র জনদুর্ভোগ তৈরি করেছে। কিন্তু জনদুর্ভোগ কমাতে এবং যানজট নিরসনে অবৈধ পার্কিং উচ্ছেদ ও ফুটপাত দখলমুক্ত করতে পারছে না সিটি করপোরেশন।
সংস্কারে বাধার নেপথ্যে কোটি টাকার চাঁদাবাজি
বছরের পর বছর কারওয়ান বাজারের প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলি-গলির ড্রেনেজ সিস্টেম, রাস্তার সংস্কার কাজ করতে পারছে না সিটি করপোরেশন। রাস্তার সংস্কার কাজ করতে হলে রাস্তা খালি করতে হবে। কিন্তু এর কোনো সুযোগই পাচ্ছে না কর্তৃপক্ষ।
কারওয়ান বাজার ঘুরে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফুটপাত ও প্রধান সড়কে ৮ ঘণ্টা পর পর ব্যবসার ধরন ও ব্যবসায়ী পরিবর্তন হয়। ৮ ঘণ্টার জন্য ব্যবসা করতে হলে ৮০০ টাকা করে দিতে হয়। প্রতি ঘণ্টায় একশ টাকা। এতে সিটি করপোরেশনের কোনো লাভ নেই। বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ হয়ে এসব ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে চাঁদাবাজরা। তাই চাইলেই সিটি করপোরেশন এদের উচ্ছেদ করে কোনো সংস্কার কাজ করতে পারছে না।
এছাড়াও সড়ক ও ফুটপাতে ভাসমান দোকানদারদের কাছ থেকেও আদায় করা হয় মোটা অঙ্কের চাঁদা। প্রতি রাতে এক হাজারের বেশি সবজির অস্থায়ী দোকান বসে, যেগুলো সকাল পর্যন্ত চালু থাকে। এসব দোকানের জায়গাও চাঁদাবাজদের নিয়ন্ত্রণে। দোকান বসাতে হলেও তাদের চাঁদা দিতে হয়। ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, তিন ফুট চওড়া ভাসমান দোকানের জন্য চার হাজার ও ছয় ফুটের দোকানের জন্য মাসে ১০ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়। এ ছাড়া দোকানের জায়গা (ফুটপাত) বরাদ্দ পেতে অগ্রিম দিতে হয় অবস্থানভেদে ৫০ হাজার টাকা থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত। মাসিক ভাড়া ছাড়াও প্রতি রাতে বসার জন্য এসব অস্থায়ী দোকানদারদেরকে আরো ৫০০ টাকা করে চাঁদা দিতে হয়।
যত্রতত্র গাড়ির অবৈধ পার্কিং
এই এলাকায় অবৈধ পার্কিং একটি বড় সমস্যা। পার্কিংয়ের নামে দিনের বেলাতেও চলে চাঁদাবাজি। পার্কিংয়ের জন্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ১০ জায়গা নির্ধারণ করে সেগুলো ইজারা দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে কোনো ইজাদারাদার না থাকলেও পার্কিং ফি আদায় করা হচ্ছে ইচ্ছামতো। যার এক টাকাও যাচ্ছে না সরকারের কোষাগারে। এ ছাড়াও জনতা টাওয়ার ও ক্রিসেন্ট মার্কেটের সামনে অবস্থান করা পিকআপ থেকে ১৫০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি ভবন থেকে পার্কিংয়ের নামে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, কারওয়ান বাজারজুড়ে যত্রতত্র অবৈধভাবে গাড়ি পার্কিং করে রাখা হয়। পণ্য আনা-নেওয়ার জন্য সারি সারি ভ্যান ও পিকাপ দাঁড় করিয়ে রাখা হয় এই এলাকার বিভিন্ন পয়েন্টে। এছাড়া বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিসে আসা গাড়িগুলোও সড়কের ওপর রাখা থাকে। ফলে সড়ক সরু হতে হতে এমন পর্যায়ে দাঁড়ায় যে গাড়ি যেমন থেমে থাকে, হাঁটারও উপায় থাকে না।
একাধিক পিকআপ চালকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাত থেকে সকাল পর্যন্ত কারওয়ান বাজার থেকে পণ্য ঢাকার বিভিন্ন স্থানে নেওয়া হয়। দিনেও কিছু কিছু ভাড়া আসে। যেহেতু কারওয়ান বাজারের পণ্য আনা-নেওয়াই মূল কাজ, তাই এখানেই গাড়ি পার্কিং করে রাখা হয়। কারওয়ান বাজারে গাড়িতে মালামাল উঠানো-নামানোয় কোনো শৃঙ্খলা নেই। ফলে দুর্ভোগ লেগেই থাকে।
ইরান পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠকে বসছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদইরান পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠকে বসছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ
ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়
কারওয়ান বাজারের ময়লা আবর্জনা একটি স্থায়ী সমস্যা। যা ভোগান্তি সৃষ্টির পাশাপাশি পরিবেশকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। কিন্তু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কার্যকর সমাধান করতে পারছে না সিটি করপোরেশন। বিশেষ করে যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ আর ময়লার কনটেইনার রাখায় রাস্তায় চলা বেশ মুশকিল। প্রকট দুর্গন্ধ ও যানজটে তৈরি হয় অসহনীয় অবস্থা। অল্প বৃষ্টি হলেই এর বেশিরভাগ অংশে পানি জমে যায়। অন্য সময় থাকে কাদা।
এ ব্যাপারে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন, পণ্য খালাসের পরে যেখানে সেখানে ময়লা ফেলে রাখা হয়। আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত করে রাখা হয় পুরো কারওয়ান বাজার। সারা রাত পণ্য খালাসের ব্যবসা করে তাদের ময়লাগুলো সেখানেই ফেলে রেখে যায়। অথচ সেই ময়লাগুলো কন্টেইনারে ফেলে রাখার কথা কিন্তু তারা সেটা করছে না।
ব্যবসায়ীদের একাধিক সমিতির নেতা মো. আজাদ খান আমার দেশকে বলেন, গত দুই মাস আগে ছয়টি রাস্তা সংস্কার করার জন্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশেনের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে একটা প্রতিবেদন জমা দিয়েছিলাম। কিন্তু কাজ হয়নি এখনো। এ ছাড়া আড়তের ভেতরের রাস্তা থেকে তেজগাঁও রেলগেট পর্যন্ত একটু বৃষ্টিতেই ভাঙা রাস্তাটা খালে পরিণত হয়। এর ওপরে রয়েছে আবার ওয়াসার ভাঙা ম্যানহোল। খুবই বিপজ্জনক অবস্থা রাস্তাটার। আর চাঁদাবাজি হচ্ছে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে সিটি করপোরেশন পণ্য খালাসের সুযোগ না দিলেই তো চাঁদাবাজি বন্ধ হয়ে যায়।
কারওয়ান বাজারের সংস্কার কাজ কেন করতে পারছে না সিটি করপোরেশন— এ বিষয়ে ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা অভিযোগ করে বলেন, অবৈধভাবে পণ্য খালাস ও ফুটপাতে অবৈধ ব্যবসা বন্ধের ব্যাপারে সিটি করপোরেশন জোরালো ভূমিকা রাখলে চাঁদাবাজি বন্ধ হয়ে যাবে। মূলত সিটি করপোরেশনই এখানে নীরব রয়েছে। তাই চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে।
সার্বিক বিষয়ে ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ আমার দেশকে বলেন, আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। খুব শিগগিরই ম্যাজেস্ট্রেট যাবে। আইন অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ বোরহান হাওলাদার জসিম, সহ-সম্পাদক মোসাম্মৎ সাথী আক্তার, বার্তা সম্পাদক মোঃ ফোরকান কাজী
বার্তা ও বাণিজ্যক কার্যালয় : ৪৩, হাটখোলা রোড চৌধুরী মল), টিকাটুলী, ঢাকা-১২০৩
সম্পাদকীয় কার্যালয় :১৯০,সি জামে মসজিদ রোড ফকিরাপুল মতিঝিল ঢাকা -১০০০
ইমেইলঃ-D[email protected]
© SomoyerKonthaNewspaper@