ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং সাবেক ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ হাসান রাসেলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত মাসুদ আলমের বিরুদ্ধে বন্ধ থাকা ব্যাংক হিসাব থেকে প্রায় ১০০ কোটি টাকা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) স্পষ্টভাবে লেনদেন বন্ধের নির্দেশ দিলেও প্রতিষ্ঠানটি এসব নির্দেশনা উপেক্ষা করে নিয়মিত অর্থ স্থানান্তরের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এ ঘটনায় সরকার, ব্যাংকিং খাত, তথ্যপ্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট মহল এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে তীব্র আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ ঘিরে তদন্তও জোরদার করা হয়েছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

সিআর মামলা নং-৪৯৯/২০২৫ এবং দণ্ডবিধির ১৪৩/১৪৭/১৪৮/৩২৬/৩০৭/১১৪/১০৯ তৎসহ বি:আ: ৩/৩এ ধারায় নথিভুক্ত অভিযোগের আলোকে বিষয়টি আরও গুরুত্ব পাচ্ছে। অভিযোগকারীরা বলছেন, বহু মামলার আসামি মাসুদ আলম নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে সরকারি প্রকল্পের বিপুল টাকা তুলেছেন এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালীদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। ফলে অভিযোগটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিচালিত ‘ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং’ প্রকল্পের বিল হিসেবে মোট দুই দফায় ২৪ কোটি টাকা করে ৪৮ কোটি টাকা প্রদান করা হয়। যথাক্রমে ৩০ জুনভিত্তিক এবং ৩০ সেপ্টেম্বরভিত্তিক বিল জমা দেওয়ার পর অর্থগুলো ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেডের ব্যাংক হিসাবে জমা হয়। অথচ সেই হিসাবটি বন্ধ রাখার নির্দেশ আগেই দেওয়া হয়েছিল। দুদক থেকে এই হিসাবসহ মাসুদ আলম, তার স্ত্রী ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যের হিসাব বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে সেই নির্দেশনা বিএফআইইউকে জানিয়েও হিসাবগুলো অবরুদ্ধ রাখার কথা বলা হয়। কিন্তু প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর কৌশলে হিসাবটি সক্রিয় রাখা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।
ব্যাংক সূত্র জানায়, বিল জমার পর অল্প সময়ের মধ্যেই সেই টাকা গোপন নথির ভিত্তিতে বিভিন্ন মাধ্যমে তুলে ফেলা হয়। এরপর পলাতক সাবেক ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ হাসান রাসেল এবং কারাবন্দী সচিব মেজবাহ উদ্দিনের কাছে অর্থের বড় অংশ সরবরাহ করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। দুদক এবং বিএফআইইউর নির্দেশনার এমন অমান্যতা খুব কমই দেখা যায় বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তারা মনে করছেন, প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় থাকায় প্রতিষ্ঠানটি সহজেই এসব কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পেরেছে।
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার তৎকালীন এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেনকে প্রায় ১০ কোটি টাকা ঘুষ প্রদান করে ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেড ৩০০ কোটি টাকার প্রকল্পটি পায়। প্রকল্প পরিচালক মো. আব্দুল হামিদ খানের বিরুদ্ধেও ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ, ঘুষ, সুপারিশ এবং রাজনৈতিক প্রভাবের ব্যবহারে প্রকল্পটি ই-লার্নিংয়ের হাতে আসে।
মাসুদ আলম অতীতে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বিভিন্ন সময় তিনি ছাত্র সংগঠন, যুব ও ক্রীড়া সংশ্লিষ্ট নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। সেই সম্পর্কের জোরেই তার প্রতিষ্ঠান ‘ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং’ বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে সংযুক্ত হতে সক্ষম হয়। এরমধ্যে সবচেয়ে বড় প্রকল্প ২৯৭ কোটি টাকার ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। এই প্রকল্প হাতে পাওয়ার সময় মাসুদ আলমের বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনে উসকানি, ছাত্র হত্যা, সরকারি সম্পদ ধ্বংসসহ প্রায় ৭০টি মামলা ছিল। এমনকি গণহত্যা মামলায়ও তার নাম উঠে আসে। এসব মামলা থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটি প্রকল্পটি পায়। বিষয়টি নিয়ে সরকারি প্রশাসনের ভেতরেও প্রশ্ন ওঠে।
প্রমিস গ্রুপ নামে একটি বড় ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন মাসুদ আলম। তিনি নগদহাট বাংলাদেশ লিমিটেড নামে মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) ধরনের একটি ব্যবসা শুরু করে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করেন। পরে প্রতিষ্ঠানটির নাম বদলে ‘প্রমিস মার্ট’ রাখেন। এই গ্রুপের অধীনে মোট ১৫টির মতো কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন, যার মধ্যে প্রমিস অ্যাসেট, প্রমিস টেক, প্রমিস আইটি সহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট মহলে তিনি ধনী উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিত হলেও তার অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, জনগণের টাকা হাতিয়ে নেওয়া এবং প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালের এপ্রিলে শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন মাসুদ আলম। ওই সময় তার জমা দেওয়া নির্বাচনী হলফনামা ও আয়কর নথিতে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত তার নিট সম্পদের পরিমাণ ছিল ৯ কোটি ৯৫ লাখ ৩১ হাজার টাকা। ২০২৩-২৪ করবর্ষে তার আয় দেখানো হয়েছে ২১ লাখ ৩ হাজার টাকা। হলফনামায় উল্লেখ আছে, তার নামে ৬টি বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে যার অর্জনমূল্য ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। তবে অনুসন্ধানকারীরা মনে করছেন, তিনি প্রকৃত সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন। কারণ তার ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা বিশ্লেষণ করে ধারণা করা হচ্ছে, তার সম্পদের পরিমাণ হলফনামার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি।
দুদক ইতোমধ্যে সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক, বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান, নিবন্ধন অধিদপ্তর, রাজস্ব বোর্ডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চিঠি দিয়ে মাসুদ আলম ও তার স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যদের সম্পদের তথ্য চেয়েছে। সম্পদের উৎস, গত পাঁচ বছরের ব্যাংক লেনদেন, ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড, প্রকল্প পাসের সময় লেনদেনসহ সবকিছু যাচাই করা হচ্ছে। পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তার ও তার স্ত্রীর বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া তিনি সংশ্লিষ্ট হওয়ায় প্রমিস গ্রুপের উচ্চপর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তাকেও নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেড বেসিস এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সদস্য। এসব প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগের জন্য দুটি আলাদা নম্বর দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে কোনো নম্বরই সচল নেই। ফলে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম নিয়ে সন্দেহ আরও বেড়েছে। আইটি খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের একটি প্রতিষ্ঠান সরকারি প্রকল্পের কাজ পেতে পারলে স্বচ্ছতার ওপর মানুষের বিশ্বাস কমে যায়। এমনকি বিদেশি বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ থাকা সত্ত্বেও কৌশলে লেনদেন করার বিষয়টি নিয়ে দুদক ও বিএফআইইউ কর্মকর্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, যদি ব্যাংকগুলো নির্দেশনা অমান্য করে থাকে, তবে সেগুলোর বিরুদ্ধেও তদন্ত হতে পারে। কর্মকর্তারা বলছেন, সাধারণত দুদকের নির্দেশ মানতেই হয়। কিন্তু এই ঘটনায় অস্বাভাবিক কিছু ঘটেছে বলেই মনে হচ্ছে। তারা মনে করছেন, অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে প্রভাব থাকা সম্ভব।
ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেডের বিরুদ্ধে অভিযোগ নতুন নয়। এর আগেও বিভিন্ন প্রকল্পে অতিরিক্ত বিল দেখানো, প্রশিক্ষণের মান নিয়ে প্রশ্ন, প্রশিক্ষণার্থীদের অসন্তোষ, সময়মতো কাজ না দেওয়া, অর্থের সঠিক ব্যবহার না নিশ্চিত করার মতো অভিযোগ উঠেছে। তবুও প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন সময় সরকারি প্রকল্পের সুবিধাভোগী হয়েছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং রাজনৈতিক পরিচয় ছিল বড় ভূমিকা।
অভিযোগ উঠেছে যে, প্রায় ৩০০ কোটি টাকার প্রকল্পটি অনুমোদনের সময় ঘুষের বড় অংশ এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেনের মাধ্যমে স্থানান্তর হয়। যার পর ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেড প্রতিষ্ঠানটির জন্য প্রকল্পের সবকিছু সহজ হয়ে যায়। অনুসন্ধানের একাধিক নথিতে সেই আর্থিক লেনদেনের উল্লেখ পাওয়া গেছে বলে তদন্ত সূত্র জানিয়েছে।
এই পুরো ঘটনা সামনে আসার পর আইটি খাতেও ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে ভালো কাজ করছে তাদের বাদ দিয়ে একটি প্রতিষ্ঠানের এভাবে অস্বাভাবিকভাবে প্রকল্প পাওয়া প্রশ্নবিদ্ধ। তাদের মতে, সঠিক দক্ষ প্রতিষ্ঠানকে সুযোগ না দিয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে প্রকল্প দেওয়া হলে দেশের কর্মশক্তি গঠনের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়।
মাসুদ আলম আড়ালে থাকলেও প্রমিস গ্রুপের কার্যক্রম চালু রয়েছে। গ্রুপের কিছু কর্মকর্তা বিভিন্ন ব্যাংকে লেনদেন করছেন এবং নতুন করে বিনিয়োগকারী খুঁজছেন। এদিকে দুদক বর্তমানে ব্যাংকের ভেতরে থাকা সব হিসাব খতিয়ে দেখছে। বিশেষ করে কোন কোন পদ্ধতিতে হিসাব অবরুদ্ধ থাকা সত্ত্বেও লেনদেন চালানো হয়েছে এবং কোথায় কোথায় টাকা গেছে তার চেইনুঅ্যানালাইসিস করা হচ্ছে।
অপরদিকে ব্যাংক কর্মকর্তারাও চাপের মুখে রয়েছেন। তারা বলছেন, উপরের নির্দেশনা ছাড়া এমন হিসাব সক্রিয় করা সম্ভব নয়। কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি নির্দেশ দিলে সেটি কার্যকর হয়ে থাকতে পারে। তবে বিষয়টি নিয়ে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে চাইছেন না।
অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে দুদক, বিএফআইইউ, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং ব্যাংকিং খাত এখন সমন্বিতভাবে কাজ করছে। তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে বড় ধরনের আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ বোরহান হাওলাদার জসিম, সহ-সম্পাদক মোসাম্মৎ সাথী আক্তার, বার্তা সম্পাদক মোঃ ফোরকান কাজী
বার্তা ও বাণিজ্যক কার্যালয় : ৪৩, হাটখোলা রোড চৌধুরী মল), টিকাটুলী, ঢাকা-১২০৩
সম্পাদকীয় কার্যালয় :১৯০,সি জামে মসজিদ রোড ফকিরাপুল মতিঝিল ঢাকা -১০০০
ইমেইলঃ-D[email protected]
© SomoyerKonthaNewspaper@